রিয়াদ হোসেন:
সময় গড়িয়েছে দুই বছর। ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০২৪ সালের জুলাই এখন ইতিহাস। কিন্তু চট্টগ্রামের মুরাদপুরের অলিগলিতে, পাঁচলাইশের হাসপাতালের করিডোরে আর স্বজন হারানো ঘরগুলোতে সেই দিনগুলো থমকে আছে।
দুই বছর পরও শুকায়নি মায়ের চোখের জল। দুই বছর পরও সন্তানেরা দরজার দিকে তাকিয়ে বাবার ফেরার অপেক্ষা করে। মুরাদপুরের দেয়ালে এখন রক্তের দাগগুলো নেই। কিন্তু মানুষের মনে দাগ কাটা আছে। যে ছেলেরা রাস্তায় নেমেছিল একটি বৈষম্যহীন দেশের জন্য তাদের শূন্যতা নিয়ে আজও ঘরগুলোতে ভোর হয়।
ষোলশহর থেকে মুরাদপুর রক্তে রাঙা জুলাই:
২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে কোটা সংস্কারের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। অল্প দিনেই নগরীর ষোলশহর রেলস্টেশন হয়ে ওঠে প্রতিবাদের প্রাণকেন্দ্র।
১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর ১৬ জুলাই বৃহত্তর সমাবেশের ডাক আসে। মুরাদপুর ও আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে। সেদিন ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের গুলিতে ঝরে যায় তিনটি তাজা প্রাণ। চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম ওমরগণি এমইএস কলেজের ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং একটি ফার্নিচারের দোকানের কর্মচারী মো. ফারুক। তাদের রক্তের ওপর দিয়েই চট্টগ্রামের আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। পরে তা দেশজুড়ে বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। জুলাই আগস্টে চট্টগ্রামে মোট ১৫ জন প্রাণ হারান। এর মধ্যে আটজনই শহীদ হন মুরাদপুরে।
মাঝরাতে এখনও ওয়াসিম বলে ডেকে উঠেন মা:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের ১ম শহীদ হিসেবে ধরা হয় মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামকে।সেসময় চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ওয়াসিম ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।তার বাড়ি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নে।মৃত্যুর দুই বছর হয়ে গেলেও পরিবার এখনও ওয়াসিমের শোকে কাতর। মা জ্যোৎস্না বেগম বিশ্বাস করতে চান না যে তাঁর ছেলে আর নেই। মাঝরাতে তিনি এখনও ‘ওয়াসিম’ বলে ডাক দিয়ে ওঠেন।
ওয়সিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, ‘চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ হয়েছে আমার ছেলে। কোনো অনুষ্ঠানে গেলে কেউ যখন ওয়াসিমের নাম উচ্চারণ করে তার সাহসিকতার প্রশংসা করে, তখন মনে হয় আমার ছেলের শহীদ হওয়া সার্থক হয়েছে। ওয়াসিমের কারণে সব জায়গায় সম্মান পাই। এটি ভালো লাগে। তবে পরক্ষণেই মনে হয় আহা আমার ছেলেকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছি!তার মা, ভাই বোনেরা এখনও তাকে খোঁজে ফিরে।
ছেলে হত্যার বিচার দেখে মরতে চান জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, ‘আমি যখন বিদেশে ছিলাম, তখন ওয়াসিমের মা চট্টগ্রামে একটি মামলা করেছিলেন।এখন হত্যাকারী, পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা, নেতৃত্বদানকারী—আমরা সবার বিচার চাই।’
আমার শান্তমণি আর নেই:
সেদিন দুপুরে রান্না করছিলেন কোহিনুর বেগম। তিনি জানালেন ছেলে হারানোর স্মৃতি-কথা। 'হঠাৎ দুই তরুণ দরজায়। তারা খুব স্বাভাবিক গলায় বলল আন্টি রেডি হন, শান্ত গুলি খেয়েছে, মেডিকেলে যেতে হবে। আমি বললাম, তোমরা এসব কী বলছো।'- কাঁপা গলায় বলেন, শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্তর মা।
তাড়াহুড়ো করে তিনি ছুটলেন চট্টগ্রাম মেডিকেলে। পাঁচলাইশ থানার ওসি নাম ঠিকানা জানতে চাইলেন। তিনি ভেবেছিলেন ছেলেকে দেখতে পাবেন। কিন্তু কেউ তাকে শান্ত'র কাছে নিল না। কিছু কাগজে সই নেওয়া হলো। পরে বুঝলেন ওগুলো পোস্টমর্টেমের কাগজ। থানায় কিছুক্ষণ থাকার পর বুঝলাম, আমার শান্তমণি আর নেই বলতে বলতে আবারও থেমে যান কোহিনুর বেগম।
শান্তর বাবা মোহাম্মদ জাকির হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ফ্যাসিবাদের পতন হলেও বৈষম্য এখনো আছে। শহীদ ও আহত পরিবারগুলো এখনো রাজপথে নামতে প্রস্তুত। তিনি গণভোট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং চট্টগ্রামের ১৫ শহীদসহ সব শহীদ পরিবারের প্রতি সমান মর্যাদার দাবি জানান।
আমার মতো আর কোনো স্ত্রী যেন বিধবা না হয়:
সীমা আক্তারের স্বামী মো. ফারুক ফার্নিচারের দোকানে কাজ করতেন। সেদিন দুপুরে খবর এলো ফারুক গুলি খেয়েছে। ছুটে গিয়ে ইমার্জেন্সিতে দেখলেন স্বামীর নিথর দেহ।
তিনি বলেন, 'আমার স্বামী নেই হঠাৎ করে আমার জীবনটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো আজ আমার জীবন অন্ধকার।' তাঁর আকুতি একটাই, আমি চাই এভাবে বাংলাদেশে আর যেন কোনোদিন কাউকে জীবন দিতে না হয়। এই স্বৈরাচার আর আমরা বাংলাদেশে দেখতে চাই না। কোথাও যেন কোনও মায়ের বুক খালি না হয় কোনও সন্তান যেন এতিম না হয় আমার মতো কোনও স্ত্রী যেন বিধবা না হয়।'
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা শাহাদাত হোসেন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার আহত ও পঙ্গুদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা আছে। তাদের সম্মান ও পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ঐতিহাসিক অধ্যায়। ওয়াসিম আকরাম, ফারুক, ফজলে রাব্বি ফরহাদ, হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ও তানভীরের আত্মত্যাগ আগামী প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেমের প্রেরণা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, শহীদ পরিবারগুলো একা নয়। জেলা প্রশাসন তাদের পাশে থাকবে। স্বজন হারানোর শূন্যতা কোনো উপহার দিয়ে পূরণ করা যায় না। তবে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি শোকাহত পরিবারগুলোর মনে কিছুটা সাহস জোগাতে পারে।
দক্ষিণপূর্ব/ জেআর