দক্ষিণ পূর্ব

আবারও চোখ রাঙাচ্ছে সন্তু লারমার জেএসএস

sathi
sathi
প্রকাশ : ৯ জুন ২০২৫
পঠিত :
আবারও চোখ রাঙাচ্ছে সন্তু লারমার জেএসএস
বিশেষ প্রতিনিধি 

হাতে ভারি অস্ত্র। পিঠে গুলি ভর্তি ব্যাগ। কোমড়ে সজ্জিত গ্রেনেড। এভাবে বান্দরবান শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সদস্যরা। চাঁদাবাজি করতে এমন রণসাজে প্রকাশ্যে নামার ছবিও এসেছে মানবজমিনের হাতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো পর্যন্ত তাদের গ্রেপ্তারে কোনো অভিযান চালায়নি বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৭৭ সালে বান্দরবান সাঙ্গু নদে পাঁচ সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও এই সংগঠন এ পর্যন্ত ৩৮ হাজার বাঙালিকে হত্যা করেছে। এছাড়া অন্যান্য পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথেও এই অস্ত্রধারী সংগঠন একপ্রকার যুদ্ধে লিপ্ত। ২০২৩ সালের ৭ এপ্রিল বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায় পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠন জনসংহতি সমিতির ব্রাশফায়ারে কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের সংঘর্ষে ৮ জন নিহত হয়েছেন। জেএসএস পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৭টি গণহত্যা চালিয়েছে। ভূষণছড়া, পাকুয়াখালী, লঙ্গদুসহ এই গণহত্যায় নিহত হয় প্রায় ৩৮ হাজার নিরীহ বাঙালী। জেএসএস'র এই সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে বহু নিরীহ উপজাতি নারী-পুরুষও।

সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবানে সেনা অভিযানের ফলে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ২ ও ৩ তারিখে রুমা ও থানচিতে সোনালী ও কৃষি ব্যাংক ডাকাতি, পুলিশের অস্ত্র লুট, ব্যাংক ম্যানেজারের অপহরণ এবং মসজিদে হামলার মতো ঘটনার পর নিরাপত্তা বাহিনী কেএনএফ-এর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করে। 

এই অভিযানে কেএনএফ তাদের পূর্বের শক্তি ও দখলকৃত এলাকা হারায় এবং সংগঠনটির প্রধান নাথান বম গা-ঢাকা দিয়ে মায়ানমার ও ভারতের মিজোরামে পালিয়ে যায়। এই শূন্যতার সুযোগ গ্রহণ করে জেএসএস পুনরায় বান্দরবানে তাদের প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে।

একসময় জেএসএস-এর আধিপত্য ছিল বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলিকদমের মতো এলাকায়। কিন্তু কেএনএফ, ম্রো বাহিনী, ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক এবং মগ লিবারেশন আর্মির উত্থানের ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কমে গিয়েছিল। 

এখন কেএনএফ-এর দুর্বলতার সুযোগে জেএসএস আবারও প্রকাশ্যে অস্ত্র মহড়া, চাঁদাবাজি ও অপহরণের মতো কার্যক্রম শুরু করেছে। চলতি বছরের ১৯ মার্চ রাঙামাটি ও বান্দরবান সীমান্তবর্তী বিলাইছড়ির বড়থলী এলাকায় কেএনএফ ও জেএসএস গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে বান্দরবানে জেএসএস-এর সন্ত্রাসী কার্যক্রম সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। তারা অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছে। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মারমা জনগোষ্ঠী জেএসএস-এর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিল স্থানীয় জনগোষ্ঠী। তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে আবারও ক্ষোভ জমা হচ্ছে স্থানীয়দের। জেএসএস-এর এই অপকর্ম শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি নয়, বরং পাহাড়ের উন্নয়ন ও শান্তি প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) হলো বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এটিই মূলত উপজাতিদের অধিকারের দাবি রেখে রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা হলেও তার অন্তরালে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, অব্যাহত চাঁদাবাজি, সশস্ত্র কার্যক্রম, হানাহানি, খুন-গুম করে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করে আসছে। বাংলাদেশের জন্মের পর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ২৪ এপ্রিল ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের খসড়া সংবিধানপ্রণেতাদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসনের দাবিসহ মোট চার দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো ছিল—(ক) পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন এবং নিজস্ব আইন পরিষদ গঠন (খ) সংবিধানে ১৯০০ সালের রেগুলেশনের অনুরূপ সংবিধির অন্তর্ভুক্তি (গ) উপজাতীয় রাজাদের দপ্তর সংরক্ষণ (ঘ) ১৯০০ সালের রেগুলেশন সংশোধনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিধিনিষেধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ।

দাবিগুলো সংবিধান ও গণতন্ত্রবিরোধী হওয়ার কারণে সে সময় দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয়। এটি মেনে নিতে না পেরে ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের তথাকথিত প্রতিনিধি ও কর্মীরা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) প্রতিষ্ঠা করেন। যাত্রার প্রথম দিক থেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি স্বায়ত্তশাসন ও জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতির অধিকারের সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। তাদের দাবি ১৯৭৫ সালে পিসিজেএসএস-এর সশস্ত্র সামরিক শাখা শান্তিবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। যদিও বিভিন্ন মাধ্যমের দাবি ১৯৭২ বা ৭৩ থেকে পিসিজেএসএস-এর সশস্ত্র শাখা ছিল। তারা প্রথম রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর আক্রমণ শুরু করে ক্ষিরাম বন বিভাগের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে। এ হামলার মধ্য দিয়ে তারা তাদের উপস্থিতি এবং শক্তির সক্ষমতা জানান দেয়। এবং ১৯৭৭ সালে বান্দরবান সাঙ্গু নদে পাঁচ সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে তারা তাদের শক্তি ও হিংস্রতা প্রকাশ করে। মূলত তারা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের একাত্তরের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। তাই সদ্য স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রের আধিপত্য এবং উপস্থিতি মেনে না নেওয়ার জন্য প্রতিবেশী একটি দেশের সরাসরি ইন্ধন ছিল।

পাহাড়ের স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদ একসময় বাঙালী ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর এক সম্প্রীতির মেলবন্ধনে আবদ্ধ ছিল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্প্রীতি এবং শান্তির প্রতীক হলেও এখন তা সন্ত্রাস, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চলের অশান্তির পেছনে অন্যতম প্রধান দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস)। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, জেএসএস আজও অস্ত্র ত্যাগ করেনি; বরং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। তারা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সন্ত্রাসবাদ অব্যাহত রেখেছে। জেএসএস-এর এই স্বেচ্ছাচারিতার ফলে ইউপিডিএফসহ (প্রসিত) আরও ছয়টি সংগঠন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। এমনকি পাহাড়ের অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীও জেএসএস-এর কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ। সংগঠনগুলো জেএসএস এর কারণেই সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএস-এর সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করতে হলে সেনা ক্যাম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি করে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে জেএসএস-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মারমা জনগোষ্ঠী যেভাবে অতীতে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল, তেমনি সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে একযোগে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এছাড়া সরকারকে পাহাড়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।