নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াকরণ (সিইপিজেড) এলাকায় আগুন লাগা ‘অ্যাডামস ক্যাপ অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড’ নামের পোশাক কারখানার ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছিল না। ভবনের আশপাশে যে ন্যূনতম খালি জায়গা রাখতে হয় তাও রাখা হয়নি। যে কারণে ভবনটির দুই পাশ দিয়ে আগুন নেভানোর সুযোগ ছিল না। এ কারণে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিসকে। ওই কারখানায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও বিকেল ৩টা পর্যন্ত পুরোপুরি আগুন নেভেনি। কারখানার ভবনটির বিভিন্ন ফ্লোরে ধ্বংসস্তূপের ভেতর আগুন জ্বলছে। বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও ইপিজেড কর্তৃপক্ষ দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে আগুন লাগা ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ভবনটি অতি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে ফায়ার সার্ভিস। বিকেল ৩টা পর্যন্ত ভবনটির ভেতর কিছু ফ্লোরে আগুন জ্বলছে। বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া। আগুন যাতে বাড়তে না পারে এজন্য পানি ছিটানো হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিট আগুন নির্বাপনের কাজ করছে। অথচ আগেরদিনও ওই ভবনে এক হাজারের বেশি লোক একসঙ্গে কাজ করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সিইপিজেডের ওই কারখানাটির সাত তলায় আগুন লাগে। আগুন পর্যায়ক্রমে নয় তলা ভবনের নিচতলা পর্যন্ত পুরোটাই ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট কাজ করেছে। পাশাপাশি আগুন নেভাতে যুক্ত হয় নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ফায়ার ইউনিট। কাজ করেছে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, সিইপিজেডের ১ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর সড়কে অবস্থিত ভবনটিতে অ্যাডামস ক্যাপ অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড এবং জিহং মেডিকেল কোম্পানি নামের দুটি প্রতিষ্ঠান আছে। ভবনটির আটতলা খালি। সাততলায় অ্যাডামস ক্যাপ অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড এবং জিহং মেডিকেল কোম্পানির গুদাম। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। অ্যাডামস ক্যাপে টাওয়েল ও ক্যাপ এবং জিহং মেডিকেল সার্জিক্যাল গাউনসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরি করা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক তাজুল ইসলাম বলেন, ভবনটি বহুমুখী কাজে ব্যবহৃত হতো। চারটি ফ্লোর গুদাম ছিল। ডাক্তারদের গাউন তৈরি হতো। দাহ্য পদার্থ পুড়তে সময় লেগেছে। অগ্নিনিরাপত্তা সনদ পেতে আবেদন করা হয়েছে কেবল। তবে নিয়ম অনুযায়ী এখনো পরিদর্শন করা হয়নি। তার আগেই দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ভবনের দুই পাশ দিয়ে আগুন নেভানোর সুযোগ ছিল না। অন্য দুই পাশ থেকে চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে। আমাদের বড় সাফল্য, অন্য ভবনের এক চতুর্থাংশ ক্ষতি হয়েছে। আগুন অন্য ভবনে ছড়িয়ে পড়েনি। এর জন্য সবাই কাজ করেছি। ১৭ ঘণ্টা টিম হিসেবে কাজ করেছি।
তিনি দ্রুত ইপিজেডের সব ভবন দ্রুত কমপ্লায়েন্স ভবনে রূপান্তর করে কার্যকারিতা সনদ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড শুধু কারখানা মালিকের নয়, দেশের জন্য ক্ষতি। এ ধরনের ক্ষতি চাই না। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ১৫ কার্যদিবসে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। তখন আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে জানা যাবে।
ভবনটির কলাম, কাঠামো দুর্বল হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবনটি এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের সামনে ব্যানার দিতে অনুরোধ জানিয়েছি। সার্ভে করার পর ভবনটি অপসারণ করা হবে কি-না সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সিইপিজেড কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক আশেক মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘অ্যাডামস ক্যাপ অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড’ কারখানায় ১ হাজার ৫০ জন শ্রমিক নিয়োজিত ছিলেন। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠে এবং শ্রমিকরা ভবনটি থেকে নেমে যান। আগুন প্রথমে ওপরের তলায় লাগার কারণে শ্রমিকরা দ্রুত এবং নিরাপদে বের হতে পেরেছে। এতে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ফায়ার কনসালটেন্টের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ৭ দিনের মধ্যে কমিটি প্রতিবেদন দেবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটার দিকে ৮ তলা ভবনের ৭ তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে। সন্ধ্যার দিকে পুরো ভবনটিতে আগুন ছড়িয়ে। দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনে আশেপাশের কয়েকশো মিটার পর্যন্ত দূরে আগুনের তাপ অনুভব হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিজিবি যোগ দেয়। কিন্তু আগুনের তীব্রতায় তারা একপ্রকার অসহায় হয়ে পড়ে। রাত ১০টার দিকে হালকা বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু তাতেও আগুন নেভেনি। আগুনে জ্বলতে জ্বলতে ভবনটির কোনো কোনো অংশ ধসে পড়ে। পরদিন (শুক্রবার) সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। তবে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে আরও সময় লাগবে বলে জানায় তারা।