দুই যুগ আগে যে সী ট্রাক আর জেটি এসে সেন্টমার্টিনের জীবন বদলে দিয়েছিল, সেই একই দ্বীপে আজ জীবিকা বন্ধ। পর্যটন সীমিত করার নামে ২০২৪ সালে নেওয়া সিদ্ধান্তে দ্বীপের ৯০ শতাংশ মানুষ কর্মহীন। বিকল্প নেই, ক্ষতিপূরণ নেই। দ্বীপজুড়ে এখন শুধু হাহাকার। ২০০২ সালে পর্যটনের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়েছিল, ২০২৪ এ বিধিনিষেধে সেন্টমার্টিনে চলছে বেকারত্ব-হাহাকার।
২০০২ সালের ১৯শে ডিসেম্বর। তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান ছাত্রদলের নেতাদের নিয়ে সেন্টমার্টিন আসেন। সেদিন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিশ্রুত সেন্টমার্টিন হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। উদ্বোধন হয় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন সিট্রাক সার্ভিস ও পর্যটকদের জন্য নির্মিত কাঠের জেটি।
দ্বীপবাসী জানায়, সেদিন পর্দানশীন মা-বোনেরা বাদে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ঘাটে জড়ো হয়। স্কুলের ছাত্রছাত্রী, শ্রমজীবী, কৃষক, জেলে—কেউ কাজে যায়নি। সেন্টমার্টিনের ইতিহাসে সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় অভ্যর্থনা। দ্বীপবাসীর এই টান ছিল জিয়া পরিবারের প্রতি। ১৯৭৮ সালে হিজবুল বাহার' এর নৌবিহারের সময় প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শহীদ জিয়া দ্বীপে এসেছিলেন। স্থানীয়রা এখনো বলেন, সেদিন মাস্টারের ছেলে মোস্তফা কামাল কাঁধে করে তাকে বোট থেকে নামিয়েছিলেন। প্রাইমারি স্কুল মাঠে মুরব্বি আব্দুল বারীকে প্রেসিডেন্ট নিজে এগিয়ে এনেছিলেন।
আব্দুল বারীর প্রশ্নের জবাবে জিয়া বলেছিলেন, 'আমি আপনাদের জন্য একটা হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, ডাকঘর, খাদ্য গুদাম, ওয়াপদা, টিএনটি ও রাস্তাঘাট করে দিতে চাই।' ২০০২ সালে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমানউল্লাহ আমান বলেছিলেন, 'শহীদ জিয়া এই দ্বীপবাসীকে ভালোবাসতেন। দ্বীপবাসী সৌভাগ্যবান যে, তাদের সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমান আজ উদ্বোধন করলেন।'
জনসভায় তারেক রহমান বলেছিলেন, 'আম্মা আপনাদের সালাম দিয়েছেন।” ১৯৯১ ও ১৯৪ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর বেগম খালেদা জিয়াও দ্বীপে গিয়েছিলেন। এরপর থেকে দ্বীপের মানুষ আদর করে তাকে তারেক জিয়া বলে ডাকে। অনেক পরিবার ছেলের নামও রেখেছে তারেক জিয়া।
ওই উদ্বোধনের আগে দ্বীপের আয়ের উৎস ছিল কৃষি, মাছ ধরা, ঝিনুক-কড়ি সংগ্রহ, প্রবাল তোলা, শেওলা, পাথর ভাঙা ও কচ্ছপের ডিম পাচার। ঝড়-ঝঞ্ঝা মাথায় নিয়ে জেলেদের সাগরে যেতে হতো। এসটি খিজির-৩ ও ৬ সিট্রাক এবং জেটি ঘাট হওয়ার পরিস্থিতি পাল্টায়। প্রাসাদ প্রাডাইজ এর মতো আবাসিক হোটেল উদ্বোধনের মাধ্যমে পর্যটনে বিনিয়োগের ডাক আসে। দ্বীপবাসী চাষাবাদ ছেড়ে রিসোর্ট করে। জেলেরা পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত হয়। কারণ দ্বীপে মাটি নেই, সেচ নেই, চাষ কঠিন।
বাইশ বছরে পর্যটনকে কেন্দ্র করে বদলেছে জীবনমান। গরীব জেলে মধ্যবিত্ত হয়েছে। বেকারত্ব কমেছে। ঘরবাড়ি ভালো হয়েছে। ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে পড়েছে। নারী শিক্ষা বেড়েছে। বাল্যবিবাহ, চোরাচালান ও মাদক কমেছিল।
২০২৪ সালে পরিবেশ রক্ষার যুক্তি দিয়ে পর্যটন হুট করে সীমিত করা হয়। একসাথে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ হয়। কিন্তু বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। সংকট মোকাবিলার কোনো প্রস্তুতিও ছিল না। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি কোনো সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সরানোর সময়ও দেওয়া হয়নি।
ফলাফল ভয়াবহ। দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষ এখন বেকার। আর্থিক সংকটে শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যাহত। সামাজিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, মানুষ আবার চোরাচালান, মাদক পাচার ও পরিবেশ ধ্বংসকারী পেশায় ফিরে যায় কি-না। বাল্যবিবাহও বাড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন, 'দুই যুগ আগে যে পথ দেখানো হয়েছিল, এখন সে পথই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের অকর্মা করে পথে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। শরণার্থীর জীবনের চেয়েও খারাপ অবস্থা এখন। একটা বন্ধুকেও দাওয়াত করে দ্বীপে আনতে পারি না।'
দ্বীপবাসীর প্রশ্ন, পরিবেশ রক্ষা জরুরি। কিন্তু বিকল্প ছাড়া হঠাৎ জীবিকা বন্ধ করে দিলে ১০ হাজার মানুষ কোথায় যাবে? সেন্টমার্টিনবাসী এখন সরকার প্রধানের হস্তক্ষেপ চায়। তারা বলছে, ২০০২ সালে যে আশীর্বাদ নিয়ে সী ট্রাক এসেছিল, ২০২৬ সালে যদি এমন একটি সী ট্রাক ব্যবস্থা করা যায় তাহলে জিঞ্জিরাবাসীর জীবনগুলো কিছুটা স্বস্তি পাবে। কারণ বর্ষায় জীবন হাতে নিয়েই কাঠের বোটে চড়ে সমুদ্রপথে যাতায়াত করতে হয় এই দ্বীপের মানুষকে।
মাসুদ ফরহান অভি/ইই