দক্ষিণ পূর্ব

এক বছরে মাঠে কে কি করেছে হিসেব মেলাচ্ছে চাকসুর ভোটাররা

sathi
sathi
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
পঠিত :
এক বছরে মাঠে কে কি করেছে হিসেব মেলাচ্ছে চাকসুর ভোটাররা
নিজস্ব প্রতিবেদক 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু) নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। আগামী ১২ অক্টোবর হবে ভোট। ভোটারদের কাছে ইতোমধ্যেই প্রার্থীরা নানাভাবে পৌঁছাচ্ছেন বার্তা। আর কাকে ভোট দিলে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত হবে, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে- ভোটাররা মিলাচ্ছেন এসব হিসেবনিকেশ। গত এক বছরে শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মকাণ্ড কোন ছাত্র সংগঠন বা কোন প্যানেলের বেশি- তাদের দিকেই রায় যেতে পারে বলে মনে করছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। 

জানা গেছে, সম্প্রীতি শিক্ষার্থী জোট নামে চাকসু নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দিতা করছে ইসলামী ছাত্রশিবির।জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হয়েছে প্রার্থীদের নাম। এছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদসহ হল ও হোস্টেল সংসদে হাজারের অধিক শিক্ষার্থী মনোনয়ন নিয়েছে।  তবে প্রকাশ্যে প্যানেল দেয়নি এনসিপির ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের (বাগছাস)।

ভোট টানতে একবছরে শিবিরের নানা কৌশল:

বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকসু টার্গেট করে ইসলামী ছাত্রশিবির বেশ কিছু কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। নবীন শিক্ষার্থীদের ভোট টানতে বছরের শুরুতেই তারা আয়োজন করা করেছে 'ফ্রেশার রিসিপশন ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন’ প্রোগ্রাম। অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তাও দিয়ে যাচ্ছে তারা। গত রমজানে টানা ২০ দিন কেন্দ্রীয় মসজিদে দিনে ২ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে ইফতার প্রোগ্রাম আয়োজন করে তারা। কোরবানির ঈদে ক্যাম্পাসে অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজন করে মেজবান। ইসলামী বক্তা শাইখ আহমাদুল্লাহকে এনে শিবির আয়োজন করে সিরাত মাহফিল। ইসলামি স্কলার শাইখ ইয়াসির কাদিকে এনে 'প্রোডাক্টিভ রমাজান' নামে একটি প্রোগ্রাম আয়োজন করেছে। গত বছরে ৫ আগস্টের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইসলামি সাংস্কৃতিক সন্ধার আয়োজন করেছে তারা। ক্যাম্পাসে আয়োজন করে 'সিরাত প্রতিযোগিতা'। শিক্ষার্থীদের মাঝে কোরআন বিতরণ করেও আলোচিত হয় ছাত্রশিবির। এছাড়া প্রত্যেকটি আবাসিক হলের সেমিনার লাইব্রেরির জন্য বিসিএস গাইড, একাডেমিক বইসহ শিক্ষা-সামগ্রী উপহার দেয় শিবির। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে 'মেডিকেল ক্যাম্পেইন' করেছে ক্যাম্পাসে। আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে 'শহীদ তরুয়া-ফরহাদ স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট' আয়োজন করে আলোচনায় ছিল শিবির। 

শিবিরের উদ্যোগে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন স্থানে বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার বসানো হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ক্যাফেটেরিয়াসহ কয়েকটি স্থানে ফিল্টার ইতোমধ্যে বসানো হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নামাজের স্থান বরাদ্দের দাবিতেও কাজ করছে শিবির। শিবিরের দাবির প্রেক্ষিতে সমাজবিজ্ঞান অনুষদে ছাত্রীদের জন্য ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট নামাজের স্থান বরাদ্দ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের কাছে টানতে শিবির ক্যাম্পাসে আয়োজন করে প্রকাশনা উৎসব। ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য স্থাপন করে তথ্য সহায়তা বুথ এবং অভিভাবকদের জন্য উপযুক্ত বিশ্রামের জায়গাও ব্যবস্থা করে আলোচনায় আসে তারা। দলীয় প্রচারণার অংশ হিসেবে চবি শিক্ষার্থীদের নিয়ে 'শিবির মিটস ব্রিলিয়ান্স' শিরোনামে প্রোগ্রাম আয়োজন করে তারা। এতে অংশ নেয় শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও শিবিরের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতিরা। এছাড়া বিভিন্ন হলগুলোতে একাডেমিক ভাল ফলাফল অর্জনকারীদের সংবর্ধনাও প্রদান করেছে তারা।

এছাড়া জুলাই বিপ্লবে চট্টগ্রামের নেতৃত্বে বিশেষ আকর্ষণ ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নেতা ইব্রাহিম রনি। তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম শহরে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। শিবির ইব্রাহিম রনিকে ভিপি প্রার্থী ঘোষণা করেছে চাকসু নির্বাচনে। এছাড়া চারুকলা ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম শহর থেকে ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনতে আন্দোলন শুরু করে ছাত্রশিবির। সবশেষ, শতভাগ আবাসন, নিরাপদ ক্যাম্পাস, সেশনজট নিরসনসহ সাতদফা দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন, মিছিল, সমাবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর চাপ প্রয়োগ করে আসছে শিবির। এছাড়া জোবরা গ্রামের স্বার্থান্বেষী লোকজনের শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালানোর প্রতিবাদে সোচ্চার থেকেছে শিবির। আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতেও শিবির ভূমিকা রেখেছে। এমনকি হাটহাজারী জামায়াতের আমির ইঞ্জিনিয়ার সিরাজ চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে অবজ্ঞা করার প্রতিবাদেও ছাত্রশিবির প্রতিবাদ জানায়। শিবিরের প্রতিবাদের মুখে জামায়াত আমীরের পদ থেকে ইঞ্জিনিয়ার সিরাজকে অব্যাহতি দেয় দলটির হাইকমান্ড। 

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন,আমরা শিক্ষার্থীবান্ধব সংগঠন।আশা করছি, চাকসু নির্বাচনে আমাদের গঠনমূলক কাজকে শিক্ষার্থীরা মূল্যায়ন করবে।

মিছিল মিটিং, দাবি জানিয়ে কাটলো ছাত্রদলের এক বছর:

২০২৩ সালের ১১ আগস্ট ২০০৮-২০০৯ সেশনের শিক্ষার্থী আলাউদ্দিন মহসিনকে সভাপতি ও ২০০৯-২০১০ সেশনের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল নোমানকে সাধারণ সম্পাদক করে  এক বছরের জন্য গঠিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কমিটি। এ কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক মিলে মোট ৫ জন নেতা হন। এই কমিটি আর কাউকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিতে পারেনি। ৫ জন মিলেই কাটিয়ে দিয়েছে ২ বছর। এ সময়ের মধ্যে নানা গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে সংগঠন গুছাতে পারেনি কমিটির নেতারা। 

তবে গত রমজানে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ইফতার মাহফিল আয়োজন করেছে ছাত্রদল। ভর্তি পরীক্ষার সময় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের হলে পৌঁছে দেওয়াসহ নানা সহযোগিতা প্রদান করা হয় ।এছাড়া জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ আল নোমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

 চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহ সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, ‘আমরা এই প্যানেল নিয়ে আশাবাদী। আমরা গত একবছরে গত এক বছরে কয়েকটি হলে ওয়াইফাই সংযোগ দিয়েছি। কয়েকটি হলে ডাস্টবিন দিয়েছি। রমজানে শিক্ষার্থী ও পথশিশুদের নিয়ে ইফতারের আয়োজন করেছি।’

সংগঠন গোছাতেই বাগছাসের বছর পার

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয় গত ২৪ আগস্ট। এতে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মুনতাসির মাহমুদ এবং সদস্যসচিব করা হয়েছে আল মাশনূনকে। ঘোষণা দেওয়া হয় ৩২ সদস্যের আহবায়ক কমিটি। কমিটি ঘোষণার পর থেকে তেমন কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা দেখা যায়নি তাদের।  চাকসু নির্বাচনে বাগছাসের পক্ষ থেকে কোনো প্রার্থী দেওয়া হয়নি। 

শিবির আর প্রশাসন বিরোধীতায় সরব ছিল বাম ছাত্রসংগঠনগুলো

গত এক বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম ছাত্রসংগঠনগুলো সক্রিয় ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে। তবে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য বেশিরভাগ ছিল শিবির ও প্রশাসনের বিরোধীতায়। বিভিন্ন সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, জাতীয় নাগরিক কমিটি, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিশ, বিপ্লবী ছাত্র পরিষদ, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, স্টুডেন্ট’স এল্যায়েন্স ফর ডেমোক্রেসি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতা ও অধিকার রক্ষা পরিষদসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সংগঠন শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে এক টেবিলে আলোচনায় বসলেও এসব বৈঠকে দেখা যায়নি ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশনসহ বাম সংগঠনের প্রতিনিধিদের। তবে আবাসন সুবিধা, শাটলট্রেনে নিরাপত্তা ও বগি বৃদ্ধি, ছাত্রীদের নিরাপত্তা ইস্যুতে সংবাদ সম্মেলন, দেয়াল লিখন, লিফলেট বিতরণ করতে দেখা গেছে তাদের। এছাড়া গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনসহ বাম ঘরানার বেশকয়েকটি সংগঠন মিলে 'বৈচিত্র্যের ঐক্য' নামে প্যানেল ঘোষণা করেছে। এতে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচন করবেন, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি ধ্রুব বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে পিপিসির সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন চাকমা এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) জাকিরুল ইসলাম জসিম।

জানা গেছে, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। সর্বশেষ চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এবার চাকসু নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বিতরণ করা শুরু হয় ১৪ সেপ্টেম্বর। ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে মনোনয়ন জমা নেওয়া শুরু হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মনোনয়পত্র গ্রহণ করে প্রার্থীরা। এই মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দি ১৮ সেপ্টেম্বর। যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হবে ২৫ সেপ্টেম্বর। এরপর ১২ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পর্যন্ত ভোট গ্রহণ হবে।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।