আবু রুহামা
চট্টগ্রামে আড়তদারদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে মৌসুমি কোরবানের চামড়া ব্যবসায়ীদের জিম্মি করার অভিযোগ উঠেছে। রাগে ক্ষোভে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া রাস্তাও নদীর পানিতে ফেলে দিয়েছেন।শুধুমাত্র চট্টগ্রাম শহরেই লাখের মতো চামড়া ফেলে দেওয়া হয় সড়ক-ফুটপাতে। এসব চামড়া নষ্ট হয়ে ছড়িয়েছে দুর্গন্ধ।
হিলভিউ এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী আহমদ হোসাইন বলেন,'আমরা ১২০ টা চামড়া সংগ্রহ করেছিলাম।প্রত্যেকটা চামড়া কিনেছি গড়ে ৫৫০ টাকা করে।আর আর অনেক দরকষাকষির পর ৩০০ টাকা করে আতুড়ার ডিপো আড়তে বিক্রি করতে হয়েছে।এই আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে আমাদের মতো মৌসুমি ব্যবসায়ীদেরকে জিম্মি করেছে।আমরা ভেবেছিলাম হাসিনা চলে গেছে,তাই এবার সিন্ডিকেট থাকবে না। কিন্তু দেখলাম ঠিক আগের মতোই সব কারসাজি।কিছুই বদলায়নি।'
মৌসুমি ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, ‘আমি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার একটি মাদ্রাসা থেকে ৭০০ পিস চামড়া কিনেছি প্রতি পিস ২০০ টাকা করে। এ চামড়াগুলো রাত ১২টার দিকে আতুরার ডিপো আড়তে নেওয়ার পর কোনও আড়তদার কেনার আগ্রহ দেখায়নি। এমনকি ৫০ টাকায়ও এসব চামড়া বিক্রি করতে পারিনি। এ কারণে আতুরার ডিপো এলাকায় সড়কের পাশে এসব চামড়া ফেলে রেখেছি।’
রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা মমতাজ উদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘আমরা ৩১০টি চামড়া বিক্রি করতে আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থিত আড়তে যাই। তখন রাত সাড়ে ৮টা। তখনও কোনও আড়তদার চামড়া কেনায় আগ্রহ দেখায়নি। শেষ পর্যন্ত ৩১০ পিস চামড়া ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। প্রতি পিস চামড়া ৮০ টাকায় বিক্রি করা হয়। এ চামড়াগুলো ট্রাক ভাড়া, শ্রমিক খরচ বাবদ খরচ হয় ১২ হাজার টাকা।’
মৌসুমি ব্যবসায়ী সেকান্দর হোসেন বলেন, '৭০০-৮০০ টাকায় কেনা চামড়া আড়তদাররা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার বেশি দিয়ে কিনতে চাইছেন না। তাদের কাছে জিন্মি হয়ে আছি।'
সরজমিনে দেখা গেছে, নগরীতে শনিবার (৭ জুন) রাত ৯টার পর আড়তদারগণ চামড়া কেনা বন্ধ করে দেয়। এরপরও চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে রবিবার ভোরেও ট্রাকে ট্রাকে চামড়া আসে আড়তগুলোতে। এতে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে সড়ক-ফুটপাতে ফেলে চলে যায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
মো. হানিফ নামে এক মৌসুমি ব্যবসায়ীর অভিযোগ, আড়তদারগণ কম দামে চামড়া কিনতে সিন্ডিকেট করেছে। যে কারণে শুরু থেকে তাদের চামড়া কেনায় আগ্রহ কম ছিল। আড়তদার সিন্ডিকেটের কারণেই মূলত এতগুলো চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে।
এদিকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আড়তদারদের সিন্ডিকেটকে দোষারোপ করলেও আড়তদাররা উলটো এই মৌসুমি ফড়িয়াদের অজ্ঞতাকে দায়ী করছেন। একইসাথে তারা দোষ চাপাচ্ছেন ট্যানারি মালিকদের ওপর। তারা বলছেন, ট্যানারি মালিকরা দাম কম দেওয়ায় তারা বেশি দামে চামড়া কিনতে পারছেন না।আড়তদাররা জানান, ট্যানারিতে বিক্রির সময় ২০ শতাংশ বাদ দিয়ে প্রতি ফুটে ৫৫-৬০ টাকা পড়ে না। এছাড়া চামড়ার মানেও পার্থক্য থাকায় দামের হেরফের হয়।
সিন্ডিকেট করে কারসাজির অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে এ বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা প্রতি পিস চামড়া ৬০০, ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকায়ও কিনেছি। আমরা কোন সিন্ডিকেট করিনি। কিছু চামড়া নষ্ট হয়েছে। কারণ আজ সকালে অনেকে চামড়া নিয়ে এসেছে। দেরিতে আনার কারণে অনেক চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘মৌসুমি বিক্রেতাদের বারবার সতর্ক করা হয়েছে। সরকার শুধু লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে, কাঁচা চামড়ার নয়। কিন্তু অনেকে এই বিষয়টা না বোঝায় নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেন, সেটিকে লবণযুক্ত করতে অনেক টাকা খরচ হয়। একটি ২০ ফুটের চামড়ায় প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও আড়তের খরচসহ প্রায় ৫০০ টাকা খরচ পড়ে। এ ছাড়া ট্যানারি মালিকরা প্রতি চামড়ার ২০ শতাংশ বাদ দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক সময় সমিতির আওতাভুক্ত ১২০ জন আড়তদার কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করতেন। লোকসানসহ নানা কারণে গত কয়েক বছরে পেশা ছেড়েছে অসংখ্য আড়তদার। বর্তমানে ৩০ জনের মতো আড়তদার কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করছেন।’
এদিকে চট্টগ্রামের একমাত্র ট্যানারি রিফ লেদারের পরিচালক মোখলেছুর রহমান বলেন, সরকার আগে থেকে চামড়ার দাম এক হাজার টাকা থেকে ১২০০ টাকা বলে দেওয়াটা সঠিক হয়নি। বেশি দামে বিক্রির আশায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করে কম দামে বিক্রি করেছে। এতে লোকসানে পড়তে হয়েছে তাদের। একইভাবে চট্টগ্রামে একসময় ১০০ থেকে ১৩০ জন আড়তদার ছিল। বর্তমানে তা কমে ২৮ থেকে ৩০ জন আড়তদার আছে। তাদের একটা সক্ষমতা আছে। এসব চামড়া প্রসেস করতে লোকবল প্রয়োজন, রাখার জন্য স্থান প্রয়োজন। পাশাপাশি চামড়া কিনতে পর্যাপ্ত অর্থ প্রয়োজন। আড়তদারদের নির্দিষ্ট টার্গেট শেষ হলে তারা চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাবে না। এ কারণে উপজেলা এবং মাদ্রাসাগুলোতে চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে চামড়া নষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।’
তিনি বলেন, ‘কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করেন। এরপর তারা আড়তদারদের কাছে চামড়া বিক্রি করেন। আড়তদারদের মাধ্যমে আমরা ট্যানারিগুলো চামড়া পেয়ে থাকি।’
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়,এবার চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় লবণ দিয়ে মোট ৭ লাখ ৭৪ হাজার ৭৫৬টি কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে।জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সরকারের বিনামূল্যে সরবরাহ করা লবণ ব্যবহার করে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে।
জানা যায়,সরকার কোরবানির মৌসুমে চামড়ার যথাযথ সংরক্ষণ এবং এতিম শিশুদের অধিকার রক্ষার জন্য সারা দেশে এতিমখানা, মসজিদ এবং মাদ্রাসাগুরোতে ৩০ হাজার টন লবণ সরবরাহ করেছে।এই সংরক্ষণ প্রক্রিয়া স্থানীয়ভাবে দুই থেকে তিন মাস ধরে কাঁচা চামড়া ব্যবহারের উপযোগী রাখবে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসন থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে পাঠানো তথ্য অনুসারে, বিভাগের মাদরাসা, এতিমখানা এবং লিল্লাহ বোর্ডিং হাউস থেকে সংগৃহীত চামড়ার মধ্যে রয়েছে ৭ লাখ ৭৪ হাজার ৭৫৬টি গরু ও মহিষের চামড়া এবং ৭৪ হাজার ৩০২টি ছাগলের চামড়া।
জেলাগুলোর মধ্যে, চট্টগ্রামে ২ লাখ ৭২ হাজার ১০০টি চামড়া, কক্সবাজারে ৩৭ হাজার ৮৮৯টি, নোয়াখালীতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৩১টি, চাঁদপুরে ২৩ হাজার ৬৫টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ৯৯ হাজার ৭৮১টি, খাগড়াছড়িতে ৫ হাজার ৮৫৯টি, লক্ষ্মীপুরে ১১ হাজার ৮৩৭টি, ফেনীতে ১৩ হাজার ৫০৯টি, রাঙ্গামাটিতে ২ হাজার ৮৪৮টি, বান্দরবানে ২ হাজার ২৯২টি এবং কুমিল্লায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৭৫টি চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে।