নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম নগরে এলপিজি গ্যাসের সংকট এখনো কাটেনি। সরকার কর ও ভ্যাট কমানো এবং ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও খুচরা বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। নগরের বিভিন্ন এলাকায় দোকানের সামনে সারি সারি খালি সিলিন্ডার পড়ে থাকলেও ভরা সিলিন্ডার মিলছে না।
বুধবার সন্ধ্যায় নগরের হালিশহর, কাজীর দেউড়ি, মেহেদিবাগ, জামাল খান, ব্যাটারি গলি ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ দোকানেই এলপিজির কোনো মজুত নেই। কোথাও অল্পসংখ্যক সিলিন্ডার এলেও তা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তাতেও অনেক ক্রেতা গ্যাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংকট বাড়ছে
এলপিজি সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন হোটেল-রেস্তোরাঁ, চা দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। রান্নার গ্যাস না থাকায় অনেক দোকান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কেরোসিন বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছেন।
কাজীর দেউড়ি এলাকার চায়ের দোকানি রহমত আলী বলেন, ‘২০০–৪০০ টাকা বেশি দিলেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ করে দিয়েছে।’
আরেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. সোহেল বলেন, ‘গ্যাস ছাড়া ব্যবসা চলে না। প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে। দ্রুত সমাধান না হলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।’
খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, কৃত্রিম সংকট
খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।
হালিশহর ঈদগাহ কাঁচা রাস্তার মাথার জাহেদ স্টোরের মালিক জাহেদ বলেন, ‘ডিলাররা সপ্তাহে এক-দুইবার মাত্র গ্যাস দেয়। এক সপ্তাহে ১৫–২০টি সিলিন্ডার পাই, যা একদিনেই শেষ হয়ে যায়। এতে ক্রেতাদের চাপ সামলানো যাচ্ছে না।’
তিনি জানান, ডিলারদের কাছ থেকে প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৪৫০ টাকায় কিনে সার্ভিস চার্জসহ ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। আবার কখনো কখনো আরও বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন।
মেহেদিবাগ এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, সারা দিন অপেক্ষা করেও একটি সিলিন্ডার আসেনি। ‘ডিলাররা বলছে, কাল আসতে পারে—এই কথা শুনে শুনে আমরা ক্লান্ত।’
ডিলারদের বক্তব্য, কোম্পানি থেকে গ্যাস নেই
ডিলাররা বলছেন, সংকট তৈরি হয়েছে কোম্পানি পর্যায়ে।
বাকলিয়া এলাকার বেক্সিমকোর এক ডিলার বলেন, কোম্পানি থেকে গ্যাস না আসায় বিক্রি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। নিউমার্কেট এলাকার বিএম এলপি গ্যাসের এক ডিলার জানান, প্রতিদিন গ্রাহকদের চাপ থাকলেও কোম্পানি থেকে সরবরাহ না পেলে তাঁদের কিছু করার নেই।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনের অভিযোগ
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, এলপিজি সংকট বারবার একইভাবে তৈরি হচ্ছে। শীতে লাইনের গ্যাস কমলেই বাজার থেকে এলপিজি উধাও হয়ে যায়, যা সিন্ডিকেটের কারসাজির ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের চেষ্টা চলছে। ভোক্তা অধিদপ্তরের নজরদারি জোরদার করা না হলে সংকট কাটবে না।’
কোম্পানির দাবি, বন্দরে জাহাজ আসেনি
বিএম এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, এক মাস আগেই এলসি খোলা হয়েছে। তবে বন্দরে এলপিজি না পৌঁছানোয় সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস এলেই বাজারে ছাড়ার কথা জানান তিনি।
প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে
সরকারি ঘোষণা, ব্যবসায়ীদের আশ্বাস আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা—সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে এলপিজি সংকট এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে। সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে, আর এই সংকটের দায় কে নেবে—সে প্রশ্নই এখন ঘুরছে নগরবাসীর মুখে।
রহা