সাইফুল ইসলাম
হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা এখন বিদেশে বিলাসী জীবন পার করছেন। হতাশ তাদের কর্মীরা। কেউ কেউ জেল খাটছেন। কেউ বা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এখান থেকে ওখানে। বাসায় থাকতে পারছেন না কেউ। কারণ জুলাই অভ্যুত্থানে নেতাদের নির্দেশে ছাত্রজনতার উপর গুলি, হামলা চালিয়েছিলেন তারা। ঘটিয়েছেন নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ফলে তারা এখন এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার ফেরারি আসামি।
চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতাদের ৯ মাসেও দেখা যায়নি কোথাও। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তারা নেই। এতে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই দিনাতিপাত করছেন তারা। মামলা-হামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। অনেকে মিছিল করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাবন্দি। এতে নেতাদের প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে তৃণমূলে। শেষমেশ নিষিদ্ধ হওয়ার পরও চট্টগ্রামের কোথাও আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো বিবৃতিও দিতে দেখা যায়নি। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের বড় নেতাদের প্রায় সকলেই আছেন আমেরিকা, লন্ডন, দুবাই কিংবা ভারতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগ কর্মী বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালীন শুধু নেতাদের হুকুম পালন করেছি। তারা শত শত কোটি টাকার মালিক হয়ে এখন আত্মগোপনে আছেন। আমাদের এতিম করে তারা বিলাসী জীবনযাপন করছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীরা পালাতে না পেরে মার খাচ্ছে, জেল খাটছে। রাতে কেউ বাসায় ঘুমাতে পারে না।
জানা গেছে, আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকেই আত্মগোপনে আছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, সাবেক হুইপ সামশুল হক চৌধুরী, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী, আবদুচ ছালাম, মুজিবর রহমান, মহিউদ্দিন বাচ্চু, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, কেন্দ্রীয় উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, নগর আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মশিউর রহমান চৌধুরী, নগর আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. এসরারুল হক, জামালখান ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন, চকবাজারের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুর মোস্তফা টিনু, ওয়ার্ড কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দীন, যুবলীগ নেতা আরশাদুল আলম বাচ্চু, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনিসহ অনেকেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বেলজিয়ামে পালিয়ে যান। ছেলের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করতে গত রমজান মাসে তিনি লন্ডনে যান। সম্প্রতি সেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে তাকে ভুরিভোজ করতেও দেখা গেছে। লন্ডনে থাকেন আলোচিত সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীও। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরী প্রায় ৫ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৬২০টি বাড়ি কেনেন। সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় আছেন বলে জানিয়েছেন তার পক্ষে রাজনীতি করা চট্টগ্রামের সাবেক দুই ছাত্রনেতা। তারা জানান, ৫ আগস্টে আ জ ম নাছির চট্টগ্রামেই ছিলেন। সেখান থেকে তিনি সবকিছু ম্যানেজ করে প্রথমে সিঙ্গাপুর ও পরে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান।
৫ আগস্টের পর সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ভারতে পালিয়ে যান। কলকাতায় একটি ভাড়া বাসায় ছিলেন তিনি। তার ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত স্ত্রী ও দুই মেয়ে লন্ডনে থাকেন। ধারণা করা হচ্ছে, ভারত থেকে তিনি লন্ডনে চলে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। দুইজনের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও এনসিপির উত্তরাঞ্চলের সংগঠক রাসেল আহমেদ বলেন, চট্টগ্রামের রাঘববোয়ালরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আন্দোলনে প্রকাশ্যে গুলি চালানো কাউন্সিলর শৈবাল দাস সুমন ও যুবলীগ ক্যাডার বাবর এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। সরকার আমাদের হতাশ করেছে। তারা খুনীদের সেইফ এক্সিট দিচ্ছে।
রাঘববোয়ালদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ। তিনি বলেন, পুলিশের অভিযানে প্রতিদিকনইউ গ্রেপ্তার হচ্ছে আসামিরা। রাঘববোয়ালদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, গত ৯ মাসে অনেক প্রভাবশালীকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ, এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, সাবেক কাউন্সিলর জসিম কি প্রভাবশালী না? সন্ত্রাসী সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। আবার অনেকে আত্মগোপনে আছেন। তাদেরও খুঁজে বের করতে পুলিশ কাজ করছে।
গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে বিনাভোটে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তারা এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমিদখল, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জড়িয়ে অনেকে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশে আলিশান বাড়ি, গাড়িসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়লেও অনেকে মোটা অংকের অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। ৫ আগস্টের পর পালিয়ে গিয়ে বিদেশে বিলাসী জীবন করতেও দেখা গেছে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপিদের।