দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনের এক নীরব নায়ক শিবির নেতা আবরার

shakhawat sohan
shakhawat sohan
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৫
পঠিত :
চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনের এক নীরব নায়ক শিবির নেতা আবরার

আহনাফ হাসান
জুলাইয়ের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সেই দিনগুলোতে চট্টগ্রামের রাজপথ ছিল এক জ্বলন্ত দাবানল। স্লোগানে মুখর প্রতিটি প্রান্তর, প্রতিরোধে শাণিত প্রতিটি মুখ। আর সেই উত্তাল তরঙ্গের গভীরে, আলো-আড়ালের সীমানায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এক তরুণ-নীরবে, নিঃশব্দে নেতৃত্ব দেওয়া এক সাহসী নায়ক। তার নাম আবরার হাসান রিয়াদ।চট্টগ্রামের জুলাই আন্দোলনের রাফি -রাসেলরা গণমাধ্যমের কল্যাণে সমন্বয়ক হয়ে ফোকাস পেলেও এই আবরার হাসান থেকে গেছেন পর্দার অন্তরালে।

আবরার ছিলেন ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরের  শৃঙ্খলা বিভাগের দায়িত্বে। তবে 'দায়িত্ব' শব্দটা আবরারের ক্ষেত্রে বড়ই সীমাবদ্ধ। আন্দোলনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন নেতৃত্বের এক অবিচল মেরুদণ্ড। মূলত শিবিরের জনশক্তিকে মাঠে নির্দিষ্ট পয়েন্টে নিয়ে আসা ও সেখান থেকে  দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে সমন্বয় করতেন আবরার।যে কারণে চট্টগ্রামে আন্দোলনের সমন্বয়কদের কাছে 'সাপ্লাইয়ার ম্যান' বলে পরিচিত ২৬ বছর বয়সী এই যুবক।

৬ জুলাই যখন শহরকেন্দ্রিক আন্দোলন নতুন গতি পায়, তখন থেকেই আবরারের কাঁধে পড়ে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। দিনরাত এক করে প্রস্তুতি-থানাভিত্তিক জনশক্তি সংগঠিত করা, ব্যানার, মাইক, লাঠি, এমনকি ইটের টুকরো সংগ্রহ করাও পড়ে তাঁর ওপর। সংগঠনের আহ্বান, কর্মীদের নিরাপত্তা আর কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন-সবই যেন হয়ে ওঠে তাঁর একান্ত দায়।

১৫ জুলাই, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের বর্বর হামলার ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠে বন্দরনগরী। পরদিন মুরাদপুর মোড়ে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা।তারপর থেকে লালদিঘি মাঠ, আদালত চত্বর, নতুন ব্রিজ, বহদ্দারহাট, নিউমার্কেট-আন্দোলনের প্রতিটি কেন্দ্রবিন্দুতে দেখা গেছে তরুণ আবরার হাসানের দৃপ্ত পদচারণা। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল কিংবা সন্ত্রাসীদের রক্তমাখা হামলাও দমাতে পারেনি তাঁকে।

কেবল মাঠে থাকা নয়, আবরার আন্দোলনের সংগঠক হিসেবেও ছিলেন শাণিত, সুশৃঙ্খল ও মেধাবী। প্রতিটি কর্মসূচির আগেই একটি অভ্যন্তরীণ মিটিং-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও মহানগরের দায়িত্বশীলদের নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়। পরে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন শৃঙ্খলা টিমের ওপর।

আবরার সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দক্ষিণপূর্বকে বলেন,১৫ জুলাই থেকে আমরা বুঝে যাই, আন্দোলন সহজ হবে না। তাই প্রতিটি কর্মসূচিকে ঘিরে পরিকল্পনার বাইরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হতো। বিশেষ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল আমাদের প্রধান দায়িত্ব।'

আন্দোলনের এই দীর্ঘ পথরেখায় কোথাও আবরার সেভাবে নিজেকে বড় করে দেখাননি। বরং প্রতিটি মুহূর্তে কর্মীদের খোঁজখবর, আহতদের পাশে দাঁড়ানো, শহীদদের জানাজায় অংশ নেওয়া, গোপনে মুক্তির ব্যবস্থা করা-সবকিছুতেই ছিলেন একান্ত নিবেদিত।রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার নজর, গ্রেপ্তারি আতঙ্ক, সন্ত্রাসীদের ছায়া-কিছুই তাঁকে একদিনের জন্যও আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করতে পারেনি।

তবে আবরার একটুো কৃতিত্ব নিতে নারাজ।তিনি বলেন, 'এই আন্দোলন সবার। এই জয় সবার। শহীদরাই আমাদের বীর। তাঁদের রক্তের ওপরই আজকের মুক্তির ভিত্তি। সেই ত্যাগ যেন কখনো বিস্মৃত না হয়-এইটাই প্রার্থনা।'

চট্টগ্রামের রাজপথে যে কয়টি মুখ ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে, আবরার হাসান রিয়াদ সেই তালিকার শীর্ষেই থাকবেন। হয়তো একজন অন্তরালের নায়ক হয়ে।যিনি নিজে আলো চাননি, কিন্তু আলো তাঁকে ঠিকই খুঁজে নিয়েছে।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।