দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রামে তেলের জন্য হাহাকার

মনির ফয়সাল
মনির ফয়সাল
প্রকাশ : ১ এপ্রিল ২০২৬
পঠিত :
চট্টগ্রামে তেলের জন্য হাহাকার

ছবি:

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় চট্টগ্রামজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারেও অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে তেলের সরবরাহ, মূল্য এবং বিতরণব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নগর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, কোথাও ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড, আবার কোথাও সীমিত সরবরাহ—সব মিলিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থার পেছনে সরবরাহ চাপের পাশাপাশি বেপরোয়া মজুদদারদের তৎপরতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, অনেক পাম্পে তেল থাকা সত্ত্বেও ‘সংকট’ দেখিয়ে বিক্রি সীমিত করা হচ্ছে। আবার কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।

 

বিপিসির তথ্য মতে, চট্টগ্রাম বিভাগে পেট্রোল পাম্প আছে ৩৮৩টি। আর এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর আছেন ৭৯৯ জন। প্যাকড পয়েন্ট ডিলার আছেন ২৫৫ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে পেট্রোল পাম্প আছে ৪৬টি। যার অধিকাংশই বন্ধ। 

 

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বিভাগের সাবেক সভাপতি এহসানুর রহমান চৌধুরী বলেন, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল মিলছে না। এজন্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তেলের অভাবে আমরা গ্রাহকদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছি।

 

অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বিভাগের সাধারণ সম্পাদক মাঈনুদ্দিন চৌধুরী বলেন, তেলের ঘাটতি আছে। তবে মানুষ মানুষ আতঙ্কিত হয়েও বেশি তেল নিচ্ছে। এতেই সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। 

এদিকে, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি (ডিজেল) না পাওয়ায় সাগরে মাছ ধরতে পারছেন না জেলেরা। ফলে ভরা মৌসুমেও ঘাটে অলস সময় পার করছেন হাজারো জেলে। ফিলিং স্টেশন বা ডিলাররা চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ করতে পারছেন না। রেশনিং পদ্ধতিতে যে পরিমাণ ডিজেল দেওয়া হচ্ছে তাতে মাঝ সাগরে গিয়ে আবার ফিরে আসার মতো পরিস্থিতি থাকছে না। এ অবস্থায় মৎস্য আহরণেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। 

 

জানা যায়, চট্টগ্রামে কয়েক হাজার ফিশিং ট্রলার থাকলেও সাগরে নিয়মিত মাছ ধরে অন্তত কয়েকশ। মাছ ধরার জেলে রয়েছেন ২ লাখের মতো। সমুদ্রগামী একটি ট্রলারের ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী এক হাজার থেকে দুই হাজার লিটার পর্যন্ত ডিজেল ধারণক্ষমতা রয়েছে। 

 

জলদাশ নামে ফিশিং ট্রলারের এক মালিক জানান, তার কাছে সাতটি ট্রলার রয়েছে। যেগুলো তিনি ভাড়া দেন। এর মধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে চারটি ঘাটে বসে আছে। অন্য তিনটি এক সপ্তাহ আগে সমুদ্রে গেছে। তবে সেগুলো ফিরে এসে পুনরায় সাগরে যেতে পারবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত তিনি।


এদিকে দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) মজুদও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের নতুন চালান না এলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির হাতে অপরিশোধিত (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) তেলের মজুত আছে মাত্র ৪০ হাজার টন। যা দিয়ে চলবে আগামী ৮ থেকে ১০ দিন। দৈনিক সাড়ে ৪ হাজার পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন এই কারখানায় বর্তমানে দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ টন করে তেল পরিশোধন করা হচ্ছে। পরিশোধিত এসব তেল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে যাচ্ছে ভোক্তার হাতে। 

 

বিপিসির তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ভারত ও চীন থেকে বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। এছাড়া পেট্রোল শতভাগ ও অকটেনের বড় অংশ দেশে উৎপাদন হয়।

 

ইস্টার্ন রিফাইনারির তথ্যমতে, দেশের এই শোধনাগারটিতে দৈনিক গড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিক টন তেল পরিশোধন করা যায়। তবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বর্তমানে দৈনিক ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টন জ্বালানি পরিশোধন করা হচ্ছে। গত ২৭ মার্চ পর্যন্ত  প্রাপ্ত  তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৩৭ হাজার ৯৯০ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রড অয়েল) মজুত রয়েছে। সেই হিসাবে আরো ৮ দিন চলবে পরিশোধন কার্যক্রম। এরপর আগামী ৬ এপ্রিল সকাল থেকে শোধনাগারটির মূল কার্যক্রম ক্রুড অয়েল পরিশোধন বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এরপর কিছুদিন সেকেন্ডারি পরিশোধন কার্যক্রম চলবে। 

 

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড সূত্রে জানা যায়, আগামী ১ অথবা ২ মে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল বহন করা জাহাজ দেশে প্রবেশ করতে পারে। জাহাজটিতে আগামী ২১ এপ্রিল সৌদি আরবের একটি বন্দর থেকে তেল লোড করার শিডিউল রয়েছে। সেটি বর্তমান সময়ের বিপজ্জনক রোড হরমুজ প্রণালি বাদ দিয়ে বিকল্প রোডে দেশে আসার কথা রয়েছে। যদিও হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসতে বাধা নেই বলছে ইরান।

 

​বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সবচেয়ে কম মজুদ আছে অকটেন ও পেট্রলের। অকটেনের মজুদ আছে মাত্র ৮ দিনের। পেট্রলের মজুদ আছে ১০ দিনের। ডিজেল ১২ দিনের মজুদ থাকলেও আমদানির ধারা স্বাভাবিক থাকায় শঙ্কা কম। পেট্রল ও অকটেনের বড় অংশই দেশীয় শোধনাগারে উৎপাদিত হয়। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক পাম্পে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ২৬ মার্চ ৩১ হাজার ২০৩ মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে। এ নিয়ে চলতি মাসে ২৮টি জাহাজ মোট ৭ লাখ ৯০ হাজার ৭৪০ মেট্রিক টন জ্বালানি পরিবহন করেছে।  এসব চালানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা এবং গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি রয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৯ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ৩৯ হাজার ৭১৬ টন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), ৭৮ হাজার ২৫ টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল, ১ লাখ ৭৬ হাজার ২০২ টন গ্যাস অয়েল, ৯ হাজার ৯০৯ টন বেস অয়েল এবং ৫ হাজার ১৯ টন মনোইথিলিন গ্লাইকল রয়েছে। এছাড়া পাইপলাইনে ভারত থেকে ডিজেল আমদানিও অব্যাহত আছে। 

 

​বিপিসি জানায়, ফার্নেস অয়েল ২৮ দিন এবং জেট ফুয়েল ২২ দিনের মজুদ থাকায় বিমান চলাচল ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে আপাতত ঝুঁকি নেই। তবে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ মেয়াদে বন্ধ থাকলে বিকল্প পথে তেল আনতে বাড়তি জাহাজভাড়া গুনতে হবে, যা সামগ্রিকভাবে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।

 

বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে ক্রুড অয়েলের সংকট থাকলেও পর্যাপ্ত পরিশোধিত তেল আমদানি করা হচ্ছে। তুলনামূলক কম হলেও ইআরএলের উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত তেল নিয়ে ১৬টি ও অপরিশোধিত তেল নিয়ে দুটি জাহাজ ছেড়ে আসার কথা ছিল। এখন পর্যন্ত আটটি জাহাজ এসেছে। পথে আছে আরও তিনটি। বাকি জাহাজগুলো কোনটি কখন আসবে, তা অনিশ্চিত। গত ৪ মার্চ সৌদি আরব ও ২০ মার্চ আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ আসার শিডিউল ছিল। জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি। এগুলো কবে আসবে তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিকলগু উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া ও ইরাকের কথা বিবেচনায় আনে বিপিসি। তবে এসব দেশ থেকে তেল আনতে সময় ও খরচ দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজ আসতে যেখানে ১২ থেকে ১৩ দিন সময় লাগে, সেখানে বিকলগু এসব উৎস থেকে আনতে সময় দ্বিগুণেরও বেশি লাগতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজ ভাড়া লাগতে পারে তিনগুণ। এই বাস্তবতায় এখনও এই অঞ্চলের দেশের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ।

 

এ বিষয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিং) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমরা রিসিভ করেছি। সেগুলো পরিশোধন করা হচ্ছে। প্রতিদিন ৩ হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার মেট্রিক টন তেল পরিশোধ করা হচ্ছে এই কারখানায়। বর্তমানে কারাখানায় অপরিশোধিত তেলের সংকট আছে।

 

এদিকে বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠে জ্বালানির সরবরাহ থাকলেও মজুতদারের কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের বেশি তেল সংগ্রহ ও মজুত করছেন। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। এছাড়া অবৈধ সুযোগসন্ধানী মজুতদার তো আছেই। 
গত ২৮ মার্চ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভাটিয়ারী পেট্রোল পাম্প নামের এক প্রতিষ্ঠানকে তেল মজুতের তথ্য গোপন করায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত ২৭ মার্চ ওই পেট্রোল পাম্পের দেওয়া তথ্য অনুসারে ১ হাজার ১০০ লিটার ডিজেল ট্যাংকে মজুত ছিল। কিন্তু ২৮ মার্চ বিকেলে পাম্পে গিয়ে দেখা যায় ওই ট্যাংকে ১ হাজার ৭০০ লিটার ডিজেল মজুত রয়েছে। এছাড়া ২৭ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ বিকেল পর্যন্ত তেল বিক্রি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। তারপরও ১ হাজার ৭০০ লিটার ডিজেল মজুত পাওয়া গেছে।

 

এছাড়া গত ২৭ মার্চ নগরের বিমান বন্দর সংলগ্ন এলাকা থেকে ২৭টি ড্রামে অবৈধ মজুত ৫ হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

 

এদিকে, দেশের জ্বালানি তেল সেক্টরে বিরাজিত অস্থিরতার মাঝে সরবরাহ চেইন ঠিক রাখতে প্রধান স্থাপনা ও ডিপো থেকে জ্বালানি তেল ছাড় করার নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করেছে বিপিসি। যা সকাল ৭টায় শুরু হয়ে বিকেল ৩টায় শেষ হবে। একইসাথে প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ট্যাগ অফিসার। জ্বালানি তেল পাচার বা অবৈধ মজুদদারি ঠেকাতে মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি।

 

এমএইচএফ

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।