নিজস্ব প্রতিবেদক:
পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নিতে নগরের বাদশাহ মিয়া সড়ক এলাকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় চলছে নানা প্রস্তুতি। বাঁশ, বেত ও কাগজ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিশাল আকারের মাছ,ঘোড়া, মোরগ ও কড়াই। কেউ কেউ কাগজ কেটে তৈরি করছে বিচিত্র বর্ণের মুখোশ। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট আয়োজন করছে বর্ণিল শোভাযাত্রা। কিন্তু এ বছর এ আয়োজনের নাম নিয়ে দেখা দিয়েছে এক ধরণের অনিশ্চয়তা।
শুক্রবার (১১ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ঘোষণা আসে, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম পরিবর্তন করে এখন থেকে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে আয়োজন করা হবে।
তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম ঠিক থাকবে নাকি পরিবর্তন হবে—তা এখনো অনিশ্চিত। যদিও ইনস্টিটিউটের পরিচালক জানিয়েছেন, শোভাযাত্রার নাম কি হবে, তা ছাত্ররাই ঠিক করবে।
শনিবার বিকেলে এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক কাজল দেবনাথ বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না শোভাযাত্রা নিয়ে। ছাত্ররা যেটা করে সেটাই।’
শনিবার সকালে সরেজমিন দেখা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের বাদশা মিয়া সড়কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালেয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিল্পী রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারি চত্বরে শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। কাগজের তৈরি সেই মুখোশে ছোট তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে অবয়ব। অনেক শিক্ষার্থী ব্যস্ত দেয়াল রাঙানোর কাজে। আবার কেউ কেউ মাটির সরা রাঙাতে ব্যস্ত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিল্পকর্ম তৈরিতে সময় কাটছে তাঁদের। তৈরি করছেন বর্ণিল রঙে আঁকা নানা প্রতিকৃতি। যার মধ্যে রয়েছে মাছ, ঘোড়া ও মোরগের প্রতিকৃতি, যা থাকবে পহেলা বৈশাখ সকালে বের হওয়া শোভাযাত্রায়।
এদিকে, পহেলা বৈশাখ সকালেই চারুকলার মূল ফটক থেকে শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে নাম নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও আয়োজনে কোনো ঘাটতি রাখছেন না শিক্ষার্থীরা। সকাল নয়টার দিকে চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। চট্টেশ্বরী মোড়-আলমাস মোড়-কাজীর দেউড়ি মোড়-এস এস খালেদ রোড-প্রেস ক্লাব ইউটার্ন-সার্সন রোড হয়ে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। আর সন্ধ্যায় চারুকলার মুক্তমঞ্চে থাকবে সাংস্কৃতিক আয়োজন। সেখানে স্থানীয় শিল্পীদেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
শোভাযাত্রা সংক্রান্ত নামের পরিবর্তন প্রসঙ্গে চারুকলার একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শোভাযাত্রার বার্তা—সাম্য, সহমর্মিতা, শান্তি ও সংস্কৃতির উদযাপন। নাম পরিবর্তন হোক বা না হোক, আমরা মূল চেতনাকে সম্মান জানাবো।’
শোভাযাত্রার নাম নিয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউট পরিচালকের ধোঁয়াশা রেখে দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চারুকলার একজন শিক্ষক বলেন, ‘ঠিক বির্তক এড়াতে নয়; মূলত নতুন প্রশাসন, নতুনভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপন হচ্ছে। আবার নতুন পরিচালক— এখন আসলে কী হবে না হবে, উনিও কিছু বলতে পারছেন না।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন শোভাযাত্রা হবে? কীভাবে হবে? ব্যানার থাকবে কি, থাকবে না সেটাও ক্লিয়ার করে বলা যাচ্ছে না। শুধু জেনেছি, যদি কিছুই না হয় তাহলে আমরা আমাদের মতো মুখোশ প্রতিকৃতি নিয়ে বেরিয়ে যাবো। ছোট করে হলেও আমরা উদযাপন করার চেষ্টা করবো।’
উল্লেখ্য, পহেলা বৈশাখ এলেই বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম আয়োজন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি নিয়ে বির্তকের মুখে পড়তে হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। নববর্ষের শোভাযাত্রা প্রস্তুতির শুরু থেকেই ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন মঙ্গল শোভাযাত্রা নামটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলো। তখন থেকে শোভাযাত্রার এই নাম পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিলো।
অবশেষে বাংলা নতুন বছর শুরুর তিন দিন আগে গতকাল (১১ এপ্রিল) এই নাম পরিবর্তনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে এক সংবাদ সম্মেলনে নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ জানান, এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম হচ্ছে 'বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা'।
এর আগে, ২৩ মার্চ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মুখে উপদেষ্টা সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেন শোভাযাত্রার আয়োজক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে।
-রহা