নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অন্যতম বৃহত্তম এতিমখানা চট্টগ্রামের চেরাগী পাহাড় এলাকার কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলাবাদী এতিমখানাটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই এতিমখানা সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। নানা ইতিহাসের সাক্ষী এই এতিমখানা থেকেও লুটপাট করেছে আওয়ামী লীগ। এতিমখানার কোটি কোটি টাকার আয়ের হিসেব নেই। ভবন নির্মাণে হয়েছে দুর্নীতি।
সরেজমিনে জানা যায়,তিনটি বহুতল ভবন থাকার পরেও ২২০ জন এতিম শিশু থাকার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। একজনের সিটে দুইজন গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে এখানে। বর্তমানে স্থান সংকুলান না হওয়ার দোহাই দিয়ে প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত এতিম শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ। অথচ তিন হাজার বর্গফুটের ছাত্রাবাসের ফ্লোর দখল করে পরিবার নিয়ে থাকছেন তত্ত্বাবধায়ক। দোকান, রেস্টুরেন্ট, ফ্লোর ভাড়া থেকে শুরু করে এতিমখানার সম্পদ থেকে হয়েছে হরিলুট। ১৫ বছর ধরে এসব লুটপাটের নেতৃত্ব দিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,এই এতিমখানার কাগজে-কলমে হর্তাকর্তা এখনও চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজম নাছির উদ্দিন৷ জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে সভাপতি। তিন বছর পরপর নির্বাচনের নিয়ম হলেও ১৫ বছর ধরে কোনো নির্বাচন করতে দেয়নি আজম নাছির। সাধারণ সম্পাদকের কর্তৃত্ব ধরে রেখে মাদ্রাসার শত কোটি টাকার সম্পদের উপর তার নেতৃত্বে চলেছে হরিলুট। এই এতিমখানার পরিচালনা কমিটিতে আজম নাছির উদ্দিনের সহযোগী হিসেবে সিনিয়র সহ সভাপতি পদে আছেন ডিস্কো শওকত। সহ সভাপতি পদে আছেন আওয়ামী লীগ নেতা মো. হাবীব উল্লাহ এবং মা ও শিশু হাসপাতালের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ। সহ-সাধারণ সম্পাদক ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আছেন আবুল কাশেম। লায়ন সানাহউল্লাহ আছেন শিক্ষা সম্পাদক হিসেবে। তাছাড়া আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর নাজমুল হক ডিউক আছেন সদস্য হিসেবে।যদিও এদের মধ্যে সৈয়দ মোরশেদ ও লায়ন সানাহউল্লাহ'র রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টটার বিষয়ে জানা যায়নি।
জানা যায়,এই কমিটির হাত ধরেই এতিম খানা ভবন নির্মাণ, ফ্লোর বিক্রি, দোকান, অফিস, রেস্টুরেন্ট ও বাসা ভাড়া আদায়, আর্থিক অনুদান, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কমচারী নিয়োগ, সরকারি ক্যাপিটেশনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং আজীবন দাতা সদস্যদের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।
জানা যায়,ঐতিহ্যবাহী এই এতিমখানা থেকে পড়াশোনা করে হাজার হাজার এতিম শিক্ষার্থী সমাজের নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তবে বিগত ১৭ বছর ধরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এতিমের সম্পত্তিগুলো সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগের নেতাদের নেতৃত্বে লুটপাট করা হয়েছে। আর তাদের সহযোগী হিসেবে ছিলেন ডিসি অফিস, সমাজ সেবা অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা।
জানা যায়,এই এতিমখানার ৪০ বছর ধরে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আছেন আবুল কাশেম।এতিমখানা ছাত্রাবাসের ৫ম তলার উপর তিন হাজার বর্গফুট জায়গায় নিজের সন্তানাদি, নাতিপুতি নিয়ে ফ্ল্যাট বানিয়ে থাকছেন তিনি।একসময় অভাবের সংসার থাকলেও এতিমখানার তত্ত্বাবধায়কের পদ তাঁর কপাল খুলে দিয়েছে। চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও কমিটির সদস্যদের এতিমখানার দোকান, অফিস বরাদ্দ দিয়ে টিকে আছেন এখনো এই পদে। তাঁর নিজ বাড়ি রাউজানে নির্মাণ করেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পতদ্যাগের দাবিতে আন্দোলন করেছিল শিক্ষার্থীরা। ৫ আগস্টের পরও শিক্ষার্থীরা তাঁর পদত্যাগের দাবি তুলে।
নিজের ইচ্ছেমতো শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে। তার নিয়োগকৃত লোকবল দিয়েই এতিমখানার মালিকানাধীন দোকান, অফিস, ঘর থেকে ভাড়া আদায় করা হয়। এতিম ছাত্রদের আবাসন সংক্রান্ত পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী কিনতেও নিয়োজিত তার লোকেরা। এসব কাজের নেতৃত্ব দেন পিয়ন আনোয়ার। পদ পিয়ন হলেও এতিমখানার এই দায়িত্ব তাকেও বানিয়ে দিয়েছে কোটিপতি। তত্ত্বাবধায়ক আবুল কাশেমের এমন দুর্নীতি বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়েও কয়েকবার অভিযোগ গেলেও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আ.জ.ম নাছির উদ্দিনের হস্তক্ষেপে দুদকের জাল থেকে বেরিয়ে যান তিনি।
কয়েকজন আজীবন দাতা সদস্য ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী জানান, নূন্যতম তদারকি ও জবাবদিহিতা নেই এই প্রতিষ্ঠানে। নামমূত্রে মূল্যে এতিমখানা মার্কেটগুলোর দোকান, বাসা, অফিস কেনা-বেচা হচ্ছে। এতিমখানার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকার। তিনটি বহুতল ভবন থাকার পরেও ২২০ জন এতিম শিশু থাকার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। একজনের সিটে দুইজন গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে এখানে। বর্তমানে প্রথম শ্রেণী হতে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত এতিম শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।
সরেজমিনে দেখায় যায়, সিডিএর অনুমোদন, নকশা প্রণয়নসহ কোনো নিয়মনিতির তোয়াক্কা না করেই একটি ৬ তলা, আরেকটি ৭তলা ও একটি ৮তলা বহুতল ভবন তৈরী করেছে এতিম খানা কর্তৃপক্ষ। এ ভবনগুলোতে ছাত্রাবাসের পাশাপাশি রয়েছে সাড়ে চার শতাধিক দোকান, অফিস, রেসটুরেন্ট ও বাসা। এখান থেকে মাসিক ভাড়া বাবদ পাওয়া যায় প্রায় ১০ লাখ টাকা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সরকারীভাবে প্রতিমাসে ২ হাজার টাকা করে ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ড পায় ১৩০ জন। একবছরে যার পরিমাণ ৩১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
ক্যাপিটেশন, ভাড়া ও অন্যান্য অনুদান হিসেবে প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি বাৎসরিক আয় রয়েছে এই এতিমখানায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক যে আয়-ব্যয় বিবরনী প্রস্তুত করা হয় তার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাউচার বানিয়ে ভুয়া অডিট করে এ হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে বর্তমানে এতিম শিক্ষার্থীদের একমাত্র খেলাধূলার মাঠে নতুন করে তৈরী করা হচ্ছে আরও একটি ৮তলা বানিজ্যিক ভবন। এ ভবন তৈরীতেও নেওয়া হয়নি সিডিএর কোনো অনুমোদন। বর্গফুট হিসেবে ইতোমধ্যে নির্মাণাধীন এই ভবনের সব ফ্লোর বিক্রি করে দিয়েছে এতিমখানা কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এতিমখানার ফান্ডে ১কোটি ৪০ লাখ টাকার মতো জমা রয়েছে। এ টাকা নয়-ছয় করতে তাড়াহুড়ো করেই এ ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি নেয়া হয়ছে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এতিমখানার তত্ত্ববধায়ক আবুল কাশেম বিরক্তির সুরে বলেন, 'খালি কদম মোবারক এতিমখানায় এতো সমস্যা না? আর কোন এতিমখানায় সমস্যা নাই? আপনি এসে দেখে যান। একপর্যায়ে তাঁর চাকরীর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দায়িত্বে থাকা এবং নানা দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন, আমি এখন কাপড় পরিস্কার করছি। আপনি এসব আলাপ রাখেন। বলেই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি সৈয়দ মোরশেদ আলম বলেন, 'নির্বাচন হয়নি এটি সত্য নয়। নির্বাচন হয়েছে। বর্তমানে কমিটিও আছে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) এতিমখানার সভাপতির দায়িত্ব রয়েছেন। এসব বিষয়ে জানতে ওনার সঙ্গে কথা বলুন। আপনি যেসব প্রশ্ন করছেন সেগুলো আসলে এখতিয়ার ভুক্ত নয়। তবে ভবন নিয়ে যা শুনেছি সেখানে একটি পানির ট্যাংক হচ্ছে। ভবনের অনুমোদন দেয় নি সিডিএ।'
তথ্যসূত্র :দৈনিক মানবজমিন