দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রাম নিয়ে জলাবদ্ধতার রাজনীতি

Riayad
Riayad
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬
পঠিত :
চট্টগ্রাম নিয়ে জলাবদ্ধতার রাজনীতি

ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপের আলোচনার পরিবর্তে শুরু হয়েছে 'রাজনীতি'। সংসদ থেকে রাজনীতির মঞ্চ পর্যন্ত গড়িয়েছে তা। গণমাধ্যমের সামনে কে কত কথা বলতে পারে এ ইস্যুতে, তা নিয়ে চলছে যেন প্রতিযোগিতা। 

 

২৮ ও ২৯ এপ্রিল নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান পানিতে তলিয়ে যাওয়া মানুষের দুর্ভোগের কথা জানালেন সংসদে। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কষ্ট উপলব্ধি করে করলেন দু:খপ্রকাশ। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরদিন এসে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বলে গেলেন চট্টগ্রামে কোথাও দুর্ভোগ নেই!

 

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৩০ এপ্রিল প্রবর্তক মোড় এলাকা ঘুরে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, 'চট্টগ্রাম শহর পানিতে ভাসছে না, সুন্দর আছে। যেরকম ছিল সেরকমই আছে।' চট্টগ্রামে ২০টি বেশি এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেলেও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দেখেছেন শুধু ৩০ ফুট এলাকাজুড়ে পানি জমে আছে! 

 

এই প্রতিমন্ত্রী একদিন পর ঢাকা থেকে এসে সকালে ও দুপুরে নগরীর তিনটি স্থানে খালের কাজ পরিদর্শন শেষে এই দাবি করেন। তাঁর দৃষ্টিতে, 'সোশাল মিডিয়াতে চব্বিশ সালের, তেইশ সালের বিভিন্ন ছবি প্রকাশ করে একটা অপপ্রচার চালানো হয়েছে যে, চট্টগ্রাম মহানগর পানির মধ্যে ভাসছে।' অথচ কোমড় সমান পানিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাৎ নিজেই নেমেছেন। তাঁর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে হিজড়া খালের উপর নির্মাণাধীন রিটেইনিং ওয়ালের কাজ থামিয়ে বাঁধ কেটে দেওয়া হয়। এতে পানি নেমে যেতে শুরু করে। 

 

এদিকে মেয়রকে দায়ী করে অনেকে কথা বললেও, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কোনো হাতে অতীতের সরকার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য কোনো প্রকল্প দেয়নি। এই প্রকল্প আছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাতে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ইস্যুতে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় রাজনীতির মাঠ এখন সরগরম। বিশেষ করে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ হলেও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে হাজার হাজার ভুক্তভোগী মানুষকে।

 

চট্টগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, জলাবদ্ধতা নিয়ে চট্টগ্রামের দুর্ভোগ কোনো সরকারী সংস্থা কমাতে পারেনি। বরং এই সমস্যা নিয়ে রাজনৈতিক 'ব্লেম গেম' খেলে ফায়দা নেওয়া হয়েছে ভোটের মাঠ থেকে। চট্টগ্রামের মানুষকে রাজনৈতিক দলের নেতারা সমস্যা সমাধানের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এসেছে বছরের পর বছর ধরে। বিনিময়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়া মানুষের নিথর লাশ উপহার পেয়েছে এই অঞ্চলের মানুষ। ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে স্বপ্নের গুছানো সংসার নষ্ট হয়েছে। অফিসগামী কিংবা দিনমজুর মানুষ, গুদামজাত পণ্যের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিয়ে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতাই এই অভাগা জনপদের মানুষ শুনে আসছে।

 

২০১০ সালের ১৭ জুন। জলাবদ্ধতার দায় মাথায় নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে পরাজিত হন প্রভাবশালী আওয়ামী রাজনীতিবিদ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তখন ধারণা করা হয়েছিল বিজয়ী মেয়র এম মনজুর আলম এই জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করবেন। একই দায় মাথায় নিয়ে মেয়র পদে নিজের মেয়াদ পূর্ণ করে ঘরে ফিরে যান মঞ্জুরল আলম। এরপর এই দায় মাথায় নিয়ে নগর পিতার আসনে বসেন আওয়ামী লীগের আরেক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ আ.জ.ম নাছির উদ্দিন। আ.জ.ম নাছির উদ্দিনের নেতৃত্বে জলাবদ্ধতা প্রকল্প স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু জলাবদ্ধতার অভিশাপ মুক্ত হয়নি। চট্টগ্রামবাসীর ভাগ্যেরও কোনো পরিবর্তন হয়নি। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বড় একটি হাটু থেকে বুক সমান পানিতে তলিয়ে যায়। পানিতে তলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। 

 

এরপর সরকার চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয় 'চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প'। খাল খনন, খাল সম্প্রসারণ, রেগুলেটর নির্মাণ, সড়ক, বাঁধ—নানা নামে তিন সরকারি সংস্থার চার প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে খরচ হয়ে গেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। ১০ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে এই খরচ করে ফেলা হয়। নগরীর মোট ৭৪টি খালের মধ্যে ৩৬টি খাল রয়েছে এই প্রকল্পের অধীনে। কিন্তু প্রবর্তক, চকবাজার, আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, জিইসি, বহদ্দারহাট, হালিশহর, নিউমার্কেট, তিন পুলের মাথাসহ অন্তত ২০টি এলাকার মানুষ সামান্য বৃষ্টিতেই থাকে পানি আতংকে। কালুরঘাট এলাকার ফরেস্ট খাল, নয়াখাল, কৃষ্ণখালি খাল ও কুয়াইশ খালের অবস্থা বেহাল। এসব খাল প্রায় ভরাট হয়ে আছে। হিজড়া খাল জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় থাকায় এই খানে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ কাজ চলছে। ফলে খালের ভেতর দিয়ে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ হচ্ছে না। 

 

এদিকে সামান্য দুইদিনের বৃষ্টিতেই শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পরিদর্শনে এসে বিতর্কিত মন্তব্য করেন, যা নিয়ে চলছে সমালোচনা। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আমার মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আমাকে সরেজমিন দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি এসে দেখলাম এবং আবারও বলছি, চট্টগ্রাম নগরী পানির ওপর ভাসছে না। চট্টগ্রাম নগরী শুষ্ক মৌসুমে যেমন থাকে, এখনো তেমনই আছে।’ প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘হঠাৎ অতিবৃষ্টির কারণে কিছুটা পানি জমলেও সঠিক সময়ে পানি আবার নিষ্কাশিত হয়ে গেছে। আমি নিজে হেঁটে যে পানির মধ্য দিয়ে এসেছি, সেটি সর্বোচ্চ ৩০ ফুট জায়গা।’

 

চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকার বাসিন্দা তৌসিফা জামান বলেন, ২৮ ও ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পানির নিচে ছিল। পানি কিছুটা নামার পর ৩০ এপ্রিল প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেন, যেগুলো থেকে পানি নেমে গেছে। প্রায়ই জলাবদ্ধ হয়ে পড়া চট্টগ্রামের নাগরিকদের মিথ্যা বানিয়ে একপ্রকার তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করে গেলেন। সরকারকে মিথ্যা তথ্য দেয়া জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।

 

জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়ন ও সমস্যা সমাধানে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) রয়েছে। মূলত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এই এই ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান তৈরি করে। এই ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান মূলত একটি 'ফাইলবন্দি' পরিকল্পনায় পরিণত হয়েছে। কারণ এই পরিকল্পনা প্রণয়নে কোটি কোটি টাকা বাজেট করে ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে নেই এমন সবকিছুই 'সাদা হাতি প্রকল্প' হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যেগুলো বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রের কাঁধে। 

 

জলাবদ্ধতা নিরসন ও বৃষ্টির পানি জমা রাখতে চট্টগ্রামে ৯টি বড় পরিসরের জলাধার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় ২০০৮ সালে। চট্টগ্রামের মাস্টার প্লান ও ডিটেইল এরিয়া প্লানে (ড্যাপ) এসব জলাধারের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক)। কিন্তু চসিকের পক্ষ থেকে এসব জলাধার নির্মাণে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। চসিকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব জলাধার নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমির স্বল্পতা রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বলছে জলাধার নির্মাণের জন্য যেসব জায়গা সিডিএ’র মাস্টার প্লানে চিহ্নিত হয়েছে সেসব জায়গা এখন উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

 

জানা গেছে, নতুন তিনটি খাল নির্মাণের পাশাপাশি চট্টগ্রামে বিভিন্ন এলাকায় ৯টি বড় আকৃতিরসহ প্রয়োজনীয় নিম্নাঞ্চলে জলাধার নির্মাণের বিষয়ে চট্টগ্রাম ড্যাপে নির্দেশনা রয়েছে। ২০ বছর আগে ১৯৯৬ সালে প্রণীত সিডিএ’র মাস্টার প্লানেও এসব জলাধার নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানা এলাকায় ৯ হেক্টর জমিতে একটি ও চান্দগাঁও থানা এলাকাতে ১০ হেক্টর জমিতে দুইটি জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এ তিনটি জলাধার নির্মিত হলে লালখান বাজার এবং পাহাড়তলীর উজানের পানি এখানে জমা হয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এসব জলাধার খননের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এছাড়া হালিশহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে পতেঙ্গা রোডের পূর্বপাশে একটি জলাধারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ রয়েছে ড্যাপে। আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকার পশ্চিমে মহেশখালের সঙ্গে ১ দশমিক ২ হেক্টর জমিতে আরও দুইটি জলাধার খননের পরিকল্পনা রয়েছে। নগরীর সদরঘাট খাল সংলগ্ন ছোট আকৃতির চারটি জলাধার খননের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় একই সময়ে। এর বাইরে ছোট পরিসরে একটি বাকলিয়া ও চান্দগাঁও এলাকায় চারটি জলাধার নির্মাণের কথা। এ পাঁচটি জলাধার নির্মিত হলে চকবাজার ও জামাল খান এলাকার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যাবে। একইসঙ্গে ওই এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনেও এসব জলাধার ভূমিকা রাখবে। ড্যাপ অনুযায়ী, সিসিসি জলাবদ্ধতা নিরসন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করবে। জলাধার নির্মাণের পর এর দায়িত্ব থাকবে চট্টগ্রাম ওয়াসার ওপর। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পানি সংকট নিরসনে এসব জলাধারের পানি ব্যবহার করবে। কিন্তু একটি জলাধারও নির্মাণ করা হয়নি চট্টগ্রামে। কারণ হিসেবে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা ক্ষোভ জানিয়ে বলছেন, জলাধার, লেক কিংবা দিঘী- এসব অল্প পয়সার প্রকল্প। কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রকল্পের জন্যতো আর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন নেই। প্রকল্প যদি হাজার কোটি টাকার উপরের না হয় কিছু উপরি কামাইতো আর করা যায় না! তাই ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানভুক্ত জলাবদ্ধতা নিরসনের সহায়ক ও কম খরচের প্রকল্প কোনো সরকার হাতে নেয়নি। 

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিণামদর্শী প্রকল্পের কারণে পরিবেশ-বিপর্যয় ঘটেছে। পাহাড়-সবুজের শহরটি ইট-পাথরের রাজ্যে পরিণত হয়ে নাগরিকের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। যে চট্টগ্রামের মানুষ হতে পারতো সবচেয়ে সুখী, সে চট্টগ্রামের মানুষ আজ দু:খ-বিলাস করে বেড়ায়। অপ্রাপ্তি, ব্যর্থতা আর কষ্ট নিয়ে অহেতুক স্মৃতি রোমন্থন করে করে বলে, একসময় আমরা অনেক ভাল ছিলাম।

 

মাসুদ ফরহান অভি/ দক্ষিণপূর্ব 

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।