দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রাম বন্দরে তরফদার সাম্রাজ্যের অবসান!

sathi
sathi
প্রকাশ : ৭ জুলাই ২০২৫
পঠিত :
চট্টগ্রাম বন্দরে তরফদার সাম্রাজ্যের অবসান!

আবু রুহামা
চট্টগ্রাম বন্দরে 'ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির' মত একচেটিয়া রাজত্ব চালিয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। টানা ১৯ বছর দেশের সবচেয়ে বড় নৌ বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি জেটির নিয়ন্ত্রণ ছিল এই কোম্পানির হাতে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার তরফদার রুহুল আমিন হয়ে উঠেছিল বন্দরের অঘোষিত রাজা। একে একে তিনি বাগিয়ে নিয়েছিলেন বন্দরের সিসিটি এবং এনসিটির টার্মিনাল পরিচালনার কাজ। আন্তর্জাতিক নিয়মের তোয়াক্কা না করেই বন্দরের কেনা যন্ত্রপাতি দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান বাহাদুরি করে চলে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে। এ যেন পরের ধনে পোদ্দারি। রাতারাতি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার সুবাদে সাইফ পাওয়ারটেককে বিশেষ সুবিধা দিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেওদের আইন পরিবর্তন করেছিল।

শেষমেশ, ক্ষমতাধর তরফদার রাজত্বের অবসান ঘটলো চট্টগ্রাম বন্দরে। চলতি বছরের জুলাই মাসেই বন্দরের 'পোদ্দারি' গুটিয়ে চলে যেতে হয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডকে।চুক্তি শেষ হওয়ায় ১৭ বছর পর গতকাল রোববার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ছেড়েছে সাইফ পাওয়ারটেক। আজ সোমবার থেকে টার্মিনাল পরিচালনা করবে নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান ড্রাইডক।রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী অপারেটর নিয়োগ না হওয়া পর্যন্তও দায়িত্ব পালন করে যেতে পারে নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানটি।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, সরকারের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর ড্রাইডকের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনার চুক্তির বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায় অনুমোদন হয়েছে। সোমবার  ড্রাইডকের সঙ্গে ছয় মাসের জন্য এনসিটি পরিচালনার চুক্তি করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই দিন সাইফ পাওয়ার টেক আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে। একই দিন থেকে নৌবাহিনীর মাধ্যমে এটি পরিচালনা করবে চিটাগাং ড্রাইডক।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টেকনিক্যাল কারণে নৌবাহিনী সরাসরি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারেনি। তবে ড্রাইডকের মাধ্যমে তারা এটি পরিচালনা করবে।

সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমীন বলেন, নৌবাহিনীকে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন তারা। এনসিটি ছাড়লেও তাদের কার্যক্রম চুক্তি অনুযায়ী বহাল আছে সিসিটিতে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৮ জুন অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে সাইফ পাওয়ারটেককে আর টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্বে না রাখার সিদ্ধান্ত হয়। একইসঙ্গে, বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত ৪২ কোটি টাকার বাজেট প্রয়োজন। এই জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, সাইফ পাওয়ারটেকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হলে, সাইফ পাওয়ারটেক সরকারি উদ্যোগটি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে।

সাইফ পাওয়ারটেক, যেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি:
বাংলায় ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত এক শ বছর এ দেশে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসন চলে। ইতিহাসে যা ‘কম্পানি শাসন’ নামে পরিচিত। এই কোম্পানি শাসনের প্রথম শাসনকর্তা ছিলেন রবার্ট ক্লাইভ। তারা এ দেশের মানুষের শ্রম, মেধা, যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের লাভ বুঝে নিয়েছিল। বিনিময়ে এদেশের মানুষের উপর চালিয়েছিল শোষণ, নিপীড়ন। চট্টগ্রাম বন্দরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুরূপ চরিত্রে হাজির হয়েছিল সাইফ পাওয়ারটেক। 

মূলত চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিত যন্ত্রপাতি মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক। মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের প্রশ্রয়ে হয়ে যায় বন্দরের নিয়ন্ত্রক। একটানা ১৯ বছর ধরে আধিপত্য বিস্তার করে এটি বন্দরের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, বন্দরে টার্মিনাল অপারেটররা নিজেদের যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করার কথা। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে এমন নিয়ম সাইফ পাওয়ারটেকের বেলায় প্রযোজ্য ছিল না।  বন্দরের নিজস্ব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে সাইফ পাওয়ারটেক। হাজার কোটি টাকা পুঁজি ছিল বন্দর কর্তৃপক্ষের, আর লাভের গুড় খেয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক। 

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নাম তরফদার মো. রুহুল আমিন। দেশের অন্য বন্দরগুলোতেও রয়েছে তার প্রভাব। এছাড়া বিদেশে ব্যবসার নামে অর্থ পাচার, নন বাইন্ডিং চুক্তির ছদ্মাবরণে শেয়ারের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মতো নানা অভিযোগও উঠেছে তার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। 
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ৩টি কন্টেইনার টার্মিনাল, একটি আইসিডি, দুটি কন্টেইনার ইয়ার্ড, বিভিন্ন ধরণের যন্ত্রপাতি, সাপ্লাই কনস্ট্রাকশন কাজসহ কিউজিসি ও আরটিজি ক্রেনগুলো চালানো এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটির হাতে রয়েছে। এছাড়া বন্দরের অভ্যন্তরে আবর্জনা ও টয়লেট পরিস্কারের কাজও তারা করছেন বলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে টেন্ডার কারসাজি করে অথবা কোনোরুপ টেন্ডার ছাড়াই প্রতি ৬ মাসে ১০ থেকে ১২% বৃদ্ধি হারে ডিপিএম পদ্ধতিতে পোর্ট ধরে রেখেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, অন্যান্য অপারেটরকে সুযোগ না দিয়ে সিসিটি তিনটি বার্থ, এনসিটি চারটি বার্থ, ঢাকা কমলাপুর আইসিডি, পিসিটি এবং ওভারফ্লো কন্টেইনার ইয়ার্ড ও সাউথ কন্টেইনার ইয়ার্ড এককভাবে প্রতিষ্ঠানটি দখল করে রেখেছে। চবকের পক্ষ থেকে সাইফ পাওয়ার প্রদত্ত সকল আদেশ, চুক্তি, ডিপিএম ভিত্তিতে কাজ চালানোর সিদ্ধান্ত যা কাগজেপত্রে রয়েছে এর সবই বন্দরের বিধিবিধান ও সরকারী আইনের পরিপন্থী বলে জানা গেছে।

জানা যায়, বিএনপি জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালে সাইফ পাওয়ারটেক বন্দরে প্রবেশ করে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে যন্ত্রপাতি মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এসময় তারা সখ্যতা গড়ে তোলে তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী প্রয়াত লে. কর্নেল (অব.) আকবর হোসেনের সঙ্গে। ওই সময় বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে অস্থিরতা চলতো। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেসরকারি অপারেটর বনে যায় সাইফ পাওয়ারটেক। এরপর এক-এগারোর সরকারের সময়েও কৌশলী অবস্থানে থেকে প্রতিষ্ঠানটি কাজ চালিয়ে নেয়। 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরপরই তরফদার মো. রুহুল আমিন মুহূর্তেই রূপ পাল্টিয়ে হয়ে যান আওয়ামী লীগের লোক। আওয়ামী লীগ নেতাদের কাজে লাগিয়ে প্রতাপের সঙ্গে বন্দরে কাজ করতে থাকেন। আবার আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এখন রুহুল আমিন তরফদার দাবি করছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালের আগে জাপানের সুমিতমো করপোরেশনের কাছ থেকে চারটি রেল মাউটেন্ট কী গ্যান্ট্রি ক্রেন সংগ্রহ করেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। মাউটেন্ট কী গ্যান্ট্রি ক্রেন পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের স্থানীয় এজেন্ট ছিল সাইফ পাওয়ারটেক। এর মধ্য দিয়েই সাইফ পাওয়ারটেকের লাভের গুড় খাওয়া শুরু। অবশ্য বন্দর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ১২টি শর্ত পরিবর্তন করিয়ে আইনি বাধা অতিক্রম করেছে তারা নিজেদের ‘ক্ষমতা’ কাজে লাগিয়ে। সিসিটি পরিচালনায় বন্দরের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সাইফ পাওয়ারটেককে বিশেষ সুবিধা দিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজদের আইন পরিবর্তন করেছিলো।

শুধু কি তাই, ২০০৬ সালে বন্দরের মাত্র ১৫০ টাকা হারে টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজের জন্য দরপত্র দাখিল করে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সর্বনিম্ন দরদাতা এই প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ না পেলেও উচ্চমূল্যে কাজটি বাগিয়ে নেয় সাইফ পাওয়ারটেক। এখন প্রতি টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য চার্জ নেওয়া হচ্ছে ৯০০ টাকা হারে।

সাইফ পাওয়ারটেকের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করেছে ২ কোটি ১০ হাজার ৭৩৯ টিইইউএস। কয়েক বছর আগে এই হার ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা। ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে চার্জ কমাতে বাধ্য হয়েছিল প্রতিষ্ঠান। বর্তমান চার্জ অনুযায়ী ১৭ বছরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বাবদ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে প্রতি টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বাড়তি নেওয়া হয়েছে ৭৫০ টাকা হারে। সেই হিসাবে শুধু কন্টেইনার হ্যান্ডলিং থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বাড়তি আয় করেছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি।

এদিকে ‘বন্দর রক্ষা আন্দোলন’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ নিয়ে সাইফ পাওয়ার টেকের মালিক তরফদার রুহুল আমিনের কথোপকথন ও চ্যাট ভাইরাল হয়েছে। যেখানে বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়া হলে বন্দর অচল করে দিতে হবে বলেও শোনা যায়। চট্টগ্রাম বন্দরের এক সভায় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে নৌ পরিবহন উপদেষ্টা এই কথোপকথন পড়ে শোনান। 

ফাঁস হওয়া ওই চ্যাটে বলা হয়, ‘যা টাকা লাগে দেবো, আমার কোনো আপত্তি নেই। যা করার করেন। সবাই মিলে বন্দর অচল করে দেবো।’ কথাগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে। উপদেষ্টার দাবি, এ আলাপ হয়েছিল বন্দর কনটেইনার হ্যান্ডলিংকে কেন্দ্র করে, যেখানে জড়িত রয়েছেন এক প্রভাবশালী অপারেটর, বিএনপি নেতা এবং স্থানীয় এক রাজনৈতিক ব্যক্তি। চ্যাটে নাম উঠে আসে নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান, সাইফ পাওয়ার টেকের মালিক তরফদার রুহুল আমিন এবং বিজিএমইএ’র সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরীর। 

কথোপকথনে দেখা যায়, বিদেশি অপারেটর এলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তুলে ধরে বন্দর অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলা হয়। একপর্যায়ে নাজিম, সবাইকে নিয়ে জরুরি মিটিং ডাকার নির্দেশ দেন স্থানীয় নাসিরকে। অপরদিকে, রুহুল আমিন বলেন, ‘সবাইকে বোঝাতে হবে-বিদেশি কোম্পানি এলে চাকরি যাবে, তাই বন্দর অচল করে দিতে হবে।'



নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।