দক্ষিণ পূর্ব

চতুর্মুখী চাপে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন

RAFIQ HYDER
RAFIQ HYDER
প্রকাশ : ৯ আগস্ট ২০২৫
পঠিত :
চতুর্মুখী চাপে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
নিজস্ব প্রতিবেদক:

জুলাই অভ্যুত্থানের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভঙ্গুর পরিস্থিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেয়। এরপর থেকে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন চাহিদা ভর করে এই প্রশাসনের উপর। বর্তমানে কয়েকটি বিষয় নিয়ে বেশ চাপে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ছাত্রসংসদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে এখনো সুরাহা করতে পারেনি প্রশাসন। আবাসিক হলে মেধার ভিত্তিতে আসন বন্টন শুরু হলেও এখনো তা শতভাগ নিশ্চিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম শাটল ট্রেনের অব্যবস্থাপনা নিয়েও ক্ষোভ জমেছে শিক্ষার্থীদের মাঝে।

অন্যদিকে শিক্ষকদের পদোন্নতি দিতে প্রশাসন তড়িঘড়ি করলেও কর্মকর্তাদের পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলছে ঢিমেতালে। বর্তমান প্রশাসনের ১০ মাসে কোনো কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়নি। হাজারো কর্মচারীর নিয়মিত পদোন্নতির প্রক্রিয়ায়ও হাত দেয়নি প্রশাসন। পদোন্নতি পেতে প্রয়োজনীয় মেয়াদ পূরণ করলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির ভাগ্য আটকে আছে প্রশাসনের জালে! এসব নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে বিরাজ করছে অসন্তোষ। এরই মধ্যে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের পদোন্নতি দ্রুত হওয়ার অভিযোগ তুলেছে অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরা। উপাচার্যের কাছে গিয়ে তারা জানিয়েছেন প্রতিবাদ।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু) নির্বাচনের জন্য প্রতিটি ছাত্রসংগঠন দাবি জানিয়ে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাকসু গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য কমিটি গঠন করে। কিন্তু নতুন প্রশাসনের ‘বয়স’ ১০ মাস পার হলেও এই সংশোধনের কাজ শেষ করতে পারেনি তারা জুলাই মাস পর্যন্ত। চাকসু নির্বাচনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চলছে ‘ধীরে চলো’ নীতিতে। এর মধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবির ৭ দফা দাবি জানিয়ে অবিলম্বে চাকসুর তফসিল ঘোষণা করতে প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা মিছিল-সমাবেশ, সাংবাদিক সম্মেলন, প্রতীকী প্রতিবাদসহ ক্যাম্পাসে নিয়মিত নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। শিবিরের ৭ দফার মধ্যে রয়েছে, শতভাগ আবাসন নিশ্চিতকরণ, চাকসু নির্বাচন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনে জড়িত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চিহ্নিত করে বিচার ও চাকরিচ্যুতি, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি সহায়তা ও আবাসন ভাতা নিশ্চিত করা, শিক্ষাজীবনের সময় নষ্ট ঠেকাতে সেশনজট দূর করা এবং যুগোপযোগী পাঠদান ব্যবস্থা চালু, শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকা-ের জন্য আধুনিক অবকাঠামো হিসেবে টিএসসি ও সেন্ট্রাল অডিটোরিয়াম নির্মাণ করা। এছাড়া জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশনসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরাও চাকসু নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, বিগত প্রশাসনগুলোর মত শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্লাটফর্ম কি প্রশাসন অকার্যকর রাখতে চাইছে? না হলে, গঠনতন্ত্র সংশোধনের নামে সময়ক্ষেপণ কেন করছে? 
প্রায় এক যুগ ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে মেধার ভিত্তিতে সিট বন্টন বন্ধ ছিল। নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিয়েই মেধার ভিত্তিতে সিট বন্টনের প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে আবেদন করে মেধা অনুযায়ী সিট পেয়েও হলে উঠছে পারছে না অনেক ছাত্রী। কারণ ওইসব সিটে আগে থেকে থাকা শিক্ষার্থীরা সিট না ছাড়ায় এই জটিলতা দেখা দিয়েছে। কয়েকটি হলে নতুন সিট পাওয়া ছাত্রীদের অনেকে উঠতে পারেনি।

শাটল ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ও অব্যবস্থাপনা নিয়েও ক্ষোভ দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। শাটল ট্রেনে সিট ও জানালা ভাঙা। রাতের ট্রেনের বগিতে জ্বলে না বাতি। শিডিউল মেনেও চলছে না ট্রেন। পর্যাপ্ত বগি সংযোজন করছে রেল কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনের উত্তর পাশে প্লাটফর্ম থাকলে দক্ষিণ পাশে নেই। ফলে ট্রেনে উঠতেই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অবশ্য শাটল ট্রেনের অব্যবস্থাপনা নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বডি। ওই স্মারকলিপিতে শাটলট্রেন ঘিরে ১১ ধরণের সমস্যার সমাধান চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রেনের সংখ্যা ও কোচ বৃদ্ধি, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় রোধ, স্টেশন ও রেলের বগিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ডেমু ট্রেন চালু করা, ট্রেনে পাওয়ার কার যুক্ত করে বাতি ও ফ্যানের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত রাখা, বগির ভেতরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ঝুঁকি নিরসন, শাটল ট্রেনের গতি বৃদ্ধি, বগি আধুনিকায়ন ও সংস্কার, স্টেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন করা, ডাবল রেল লাইন চালু করা, প্লাটফর্মের পরিসর বৃদ্ধি করা। 

শিক্ষকদের পদোন্নতি হচ্ছে দ্রুত, ভাগ্য ঝুলে আছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের: শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে যারা প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের শাসনামলে নিয়োগপ্রাপ্ত। এদের মধ্যে ছাত্র খুনের আসামী থেকে শুরু করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাও আছেন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশেই এই শিক্ষকদের বেশিরভাগের চাকরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেককে নিয়োগ দিতে শিক্ষক নিয়োগের শর্ত শিথিল করা হয়েছে। শর্ত পূরণ না করেও অনেকে শিক্ষক হয়েছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর প্রফেসর ড. ইয়াহ্ইয়া আখতারের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন শিক্ষকদের দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পদোন্নতি বোর্ড ঘোষণা করা শুরু করেন। প্রশাসনের শিক্ষকদের প্রতি উদারপন্থী আচরণের ফাঁকে আওয়ামীপন্থি প্রায় সব শিক্ষকই পদোন্নতি পেয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকের অভিযোগ, পদোন্নতিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত শিক্ষকদের পদোন্নতির আয়োজন নীরবে এবং দ্রুত গতিতে হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কর্মকর্তা, কর্মচারীদের পদোন্নতি ঝুলে আছে এখন পর্যন্ত। কয়েকবছর ধরেই এসব পদোন্নতি আটকে থাকলেও কোনো সুরাহা করছে না প্রশাসন। শিক্ষকদের পদোন্নতি নিশ্চিতের জন্য প্রশাসন রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে উদারতা প্রদর্শন করলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেলায় উদাসীন। অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রশাসনকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, আমরা চাকসু নীতিমালা এবং হল সংসদের নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির হয়ে জমা দিয়েছি। পরিপূর্ণ নীতিমালা করা হয়েছে। ১ আগস্টের সিন্ডিকেটে অনুমোদন হওয়ার পরে চাকসু নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে। আমরা প্রশাসনে আসার কিছুদিন আগেই কর্মকর্তাদের পদোন্নতিগুলো সম্পন্ন হয়েছিল, তাই আমাদের আর তা করতে হয়নি। আমরা তাদের অনুরোধে দুইবার পদোন্নতি বোর্ডের রিভিশন দিয়েছি। হলের বিষয়টি হল প্রশাসনের দেখা দরকার। হল প্রশাসনের নিয়মিতভাবে পরিদর্শন করার নিয়ম রয়েছে, যার নামে সিট তাকে কয়েকবার না পাওয়া গেলে তার নামে বরাদ্দ সিটে বাতিল করার নিয়ম রয়েছে। শাটল ট্রেনের সমস্যাও সমাধানের জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে বসেছে প্রক্টরিয়াল বডি। সেটা সমাধান করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আর কিছু বিষয় সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। 


রহা

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।