দক্ষিণ পূর্ব

চবির সমাবর্তন আয়োজনে চোখে পড়েছিলো যেসব অসঙ্গতি

sathi
sathi
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৫
পঠিত :
চবির সমাবর্তন আয়োজনে চোখে পড়েছিলো যেসব অসঙ্গতি
চবি সংবাদদাতা

বর্ণাঢ্য আয়োজনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ম সমাবর্তন সম্পন্ন হয়েছে।অনেকটা গুছানো অনুষ্ঠান হলেও আয়োজকদের কয়েকটি বিষয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।এরমধ্যে রয়েছে কোনো গ্র্যাজুয়েটকে তাদের  অনুভূতি শেয়ারের সুযোগ দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

বুধবার (১৪ মে) দুপুর ২ টা থেকে চবির কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর সমাবর্তন নিয়ে পানির দুস্পাপ্যতা থেকে শুরু করে গাড়ীর সল্পতা একের পর এক অভিযোগ তুলেন গ্র্যাজুয়েটরা।

চবির ৫১ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সালাউদ্দিন আফরান  বলেন,'এ কেমন সমাবর্তন হয়েছে কিছু বুঝিনি। কোনো শিক্ষার্থীকে তার অনুভূতি শেয়ারের সুযোগ দেওয়া হয়নি। যাতায়াতের জন্য যে গাড়ির ব্যবস্থা করার কথা হয়েছিল সেগুলো দেখা যায়নি সকালে ছাড়া।'

আরেক গ্র্যাজুয়েট সাদেকুর রহমান বলেন,এতোদিন ধরে প্রশাসনকে ভেবেছি তারা তৈলমর্দনের মানুষ না। তারা সবার উর্ধ্বে স্টুডেন্টকে অগ্রাধিকার দিতে বদ্ধপরিকল্প। তারাও সময়ের সাথে তৈলমর্দনকে জীবনের শেষ সম্বল  হিসেবে বেছে নিয়েছে।

এই শিক্ষার্থী বলেন,ডক্টর ইউনুসের জন্য সম্মান দেখাতে গিয়ে চবি প্রশাসন ২৩ হাজার স্টুডেন্টের সাথে অসম্মান দেখিয়ে। ব্যবস্থাপনা তো নাজুক ছিল এর চেয়ে বেশি খারাপ লেগেছে অনুষ্ঠানের মধ্যে ৮০ শতাংশ কথা শুধু ডক্টর ইউনুসকে নিয়ে।  এটা তেলমর্দন নয় কি? যে খরচটা শুধু তৈলমর্দনে ব্যবহৃত হয়েছে আশা করছি সামনের কনভোতে খরচটা কমিয়ে এনে স্টুডেন্ট যাতে নির্বিঘ্নে এসে প্রশান্তি লাভ করে তাদের শেষ দিনটা কাটাতে পারে সে চেষ্টা করবেন।

গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আদরিত সাদ বলেন,
'প্রশাসনের কাজ কি শুধু ড. ইউনূসকে ডি.লিট দেয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ? আপনারা ৯ বছর পর একটা সমাবর্তন আয়োজন করলেন সেটার জন্য ধন্যবাদ । কিন্ত আপনারা কি একবার ভেবেছেন এই ২৫-৩০ হাজার মানুষ ক্যাম্পাস থেকে বাসায় যাবে কীভাবে? বাসায় যাওয়া বাদ দেন।  এক নাম্বার পর্যন্ত এতগুলো মানুষ কিভাবে যাবে আপনারা ভেবেছেন? টিচারদের এতোগুলা বাস ।  আজকে চক্রাকার বাস হিসেবে  ব্যবহার করা যেতোনা?  আমরা যারা রানিং স্টুডেন্ট তারা একটা সপ্তাহ অসহনীয় লোডশেডিং সহ্য করেছি,আমাদের কনভোরা যাতে একটু ভালোমতো তাদের প্রাপ্য বিদায় টাপান।  আপনারা ইউনূসকে ডি.লিট দিয়ে নিজেরা ডিলিট হয়ে বসে আছেন ।'

এই বিষয়ে চবি প্রক্টর তানভীর হায়দার আরিফ বলেন,
সবকিছুর জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া।  অনেকগুলো সমালোচনা ছিল যৌক্তিক। সেই সমালোচনা সামনে আসছে। আমি নিজেও সামনে আনতে চাই ভালোর জন্য। যাতে পরবর্তীতে আরো ভালোভাবে সব কিছু করা যায়।

এদিকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার পরও সমাবর্তন ঘিরে প্রাণের মেলা বসেছিলো ১৭৫০ একর আয়তনের সবুজ এই ক্যাম্পাসে।গ্র্যাজুয়েটদের সঙ্গে উৎসবে মেতেছেন তাদের স্বজনরাও।দুই দিন আগ থেকেই (১২ মে) সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস মুখর হতে থাকে গ্র্যাজুয়েটদের পদচারণে। সবাই মেতে ওঠেন দিনটিকে ফ্রেমে বন্দি করে রাখার প্রতিযোগিতায়। শহীদ মিনার, সাইন্স ফ্যাকাল্টি মসজিদ,বুদ্ধিজীবী চত্বর, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, সেন্ট্রাল ফিল্ড-সবখানে যেন ছিল ছবি তোলার মহোৎসব।

তবে দুই দিন ধরে ছবি তুললেও সমাবর্তনের দিনে ছবি তোলার বিশেষ আবেদন অগ্রাহ্য করতে পারেননি শিক্ষার্থীরা। শেষ মুহূর্তে সবারই চাওয়া ছিল চার বছরের স্নাতক জীবনের আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপনী দিনের মুহূর্তগুলো ধরে রাখা। তাই তো অধিকাংশ শিক্ষার্থী গ্রাম থেকে নিজের বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের এনেছেন ক্যাম্পাসে। বাবার গায়ে গাউন আর মায়ের মাথায় তুলে দিচ্ছেন সমাবর্তনের বিশেষ টুপি। তাদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন ক্যাম্পাস। নিয়ে যাচ্ছেন নিজের আবাসিক হল দেখাতেও।

ক্যাম্পাসে এসেছিলেন বাংলা বিভাগের আব্দুল্লা মাসুদ। পরে প্রিয় ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়েই সমাবর্তনের টুপি বাবাকে পরিয়ে দেন। যে মানুষটির অকুণ্ঠ সমর্থন ও পরিশ্রমে এত দূর আসা, যেন এভাবেই তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি।

সমাবর্তন নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শাওন নামে এক শিক্ষার্থী জানান, সমাবর্তনের দিনটি তার কাছে বিশেষ একটি দিন। এ দিনের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। স্মৃতির পাতায় দিনটি ধরে রাখতে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলেছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া গাউন ফেরত নেওয়ার আগে আরও কিছু চমৎকার মুহূর্তকে ফ্রেমবন্দি করার ইচ্ছে শাওনের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের  শহীদ মিনারে কথা হয় আরেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তিনি জানান, আজকের দিনটি তার কাছে একটু বিশেষ। তিনি সন্তান এবং স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে ৯ম সমাবর্তনে যোগ দিয়েছেন। 

সামিয়া নামে এক অভিভাবক সন্তানের সমাবর্তনে আসার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমিও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। ৩৩ বছর আগে এখানে আমাদের পদচারণ ছিল। আমি সে সময় সমাবর্তন নিতে পারিনি। কিন্তু আমার মেয়ে সমাবর্তন পেয়েছে। তার সমাবর্তনের আনন্দ ভাগাভাগি করতে আমি এসেছি।’

এর আগে দুপুর ১ টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে শুরু হয় সমাবর্তন অনুষ্ঠান। বিপুল পরিমাণ কনভোকি এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। এতে প্রধান উপদেষ্টাকে ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এছাড়া ৫ম সমাবর্তনে পিএইচডি ডিগ্রি পাচ্ছেন ২২ জন গবেষক। মোট ১৭ জনকে এমফিল ডিগ্রি প্রদান করা হয়। বর্তমান সরকারের চারজন উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। 

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে চট্টগ্রাম  বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ইয়াহিয়া আক্তার   বলেন, ‘অর্জিত এই বিদ্যা, এই সনদ, এই প্রজ্ঞা সমাজে আলো ছড়ানোর আগে যেন তোমাদের অন্তরকে সম্পূর্ণরূপে আলোকিত করে, সেই চেষ্টা করবে। তোমরা তোমাদের অনুজদের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেদের মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

উপাচার্য আরও বলেন, ‘বর্তমান পৃথিবী তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর। তোমরা সর্বদা এর ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকবে। মানবসভ্যতার উন্নয়নে যেই প্রযুক্তি তোমাদের ব্যবহার করার কথা, সচেতন থেকো সেই প্রযুক্তি যেন তোমাদের ব্যবহার করে না ফেলে। নিজেদের সময়কে সর্বোচ্চ সুন্দর এবং সৃষ্টিশীল কাজের পেছনে ব্যয় করো।’

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।