মাসুদ আলম
চট্টগ্রামের মানুষের ভারতমুখী চিকিৎসার বিকল্প হতে যাচ্ছে চীন। চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কুনমিংয়ের আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ শুরু হতে চলেছে। এ সুযোগ বেশি পাবে চট্টগ্রামের মানুষ।
এ জন্য শুরু হচ্ছে চীনের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার প্রক্রিয়া। পাশাপাশি চিকিৎসা প্রক্রিয়া স্পষ্ট করার বিষয় নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসা গ্রহণের সুবিধার্থে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর জন্য অনুবাদ টিম গঠন করার বিষয়টিও সামনে রয়েছে।
ইতোমধ্যে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস চট্টগ্রাম থেকে কুনমিং ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে। চট্টগ্রামের সন্তান নোবেল বিজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৎপরতায় এ সুযোগ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ সুবিধা চালু হলে ভারতে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে।
ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের হেলথ কমিটির ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বছরে ২৪ লাখ ৭০ হাজার মেডিকেল ট্যুরিস্ট বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা মানুষ মেডিকেল ট্যুরিজমে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করে। এটা যারা মেডিকেল ভিসা নিয়ে যাচ্ছে তাদের তথ্য। এছাড়া অন্য ভিসাগ্রহীতারাও আছেন। পশ্চিমবঙ্গ ও তামিল নাড়ু, দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, সিএমসি ভেল্লোর, বেঙ্গালুরু ও হায়দ্রাবাদে চিকিৎসা নিতে ছুটছে বাংলাদেশী নাগরিকরা।
তবে গত বছরের ৫ আগস্টের পর ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশিদের যাতায়াত সীমিত করা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য ভিসা জটিলতায় ভুগছেন বাংলাদেশিরা। বিপরীতে বৃহৎ অর্থনৈতিক মুনাফা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে ভারতীয় চিকিৎসা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
চীনে চিকিৎসা গ্রহণ পদ্ধতি সহজ করার খবর ছড়িয়ে পড়তেই কোলকাতাসহ ভারতের বেসরকারি হাসপাতালগুলো দুশ্চিন্তায় পড়েছে। বাংলাদেশের রোগীদের সেবা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের যে বিশাল আয়ের উৎস তৈরি হয়েছিল, তা এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কোলকাতার হাসপাতালগুলোর হিসেবে, বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এই ক্ষতি সামাল দিতে হাসপাতালগুলো প্রথমে এটি সাময়িক বলে মনে করেছিল। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ক্রমাগত অবনতির ফলে তারা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।
জানা গেছে, চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের মানুষ সহজে চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কুনমিংয়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
গত ৩০ মার্চ চীনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুসের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি জানান, চীন এরই মধ্যে কুনমিংয়ের চারটি হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীদের জন্য বিশেষভাবে বরাদ্দ করেছে।তবে বিমান ভাড়ার উচ্চ খরচকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুনমিং ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর ফলে ভ্রমণের খরচ ও সময় উভয়ই কমে যাবে। ফলে বাংলাদেশি রোগীরা সহজেই চীনের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
বাংলাদেশের চীনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত নাজমুল ইসলাম বলেছেন, কুনমিং কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি রোগীদের জন্য হাসপাতালের নির্দিষ্ট ফ্লোর বরাদ্দ করেছে। চিকিৎসার খরচও বেশ যুক্তিসংগত। একজন বাংলাদেশি রোগী চীনা নাগরিকদের সমান খরচেই চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন।কুনমিং ভ্রমণ সহজতর করতে ঢাকা ও কুনমিং রুটে বিমান টিকিটের দাম কমানোর উদ্যোগও নিয়েছে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশিদের জন্য আরও স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা উন্মুক্ত করবে।এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ থেকে একটি বড় সাংবাদিক দল কুনমিং সফরে যাবেন। তারা সেখানে চিকিৎসা সুবিধাগুলো সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করবেন।
গত মাসে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি রোগী প্রথমবারের মতো কুনমিংয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। তারা হাসপাতালের মানের প্রশংসা করেছেন। তবে অনেকেই বিমান ভাড়ার উচ্চ খরচ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এই বিমান ভাড়া কমাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ শুরু করেছে। চট্টগ্রাম-কুনমিং রুটে ফ্লাইট চালু হবে অনেকটা কম খরচেই। এতে চীনে চিকিৎসা নেওয়ার দুয়ার খুলে যাবে চট্টগ্রামবাসী।
এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারী বাংলাশের চীনা দূতাবাসে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সফরের সময় তিনি জনস্বাস্থ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের প্রস্তাব দেন। বিশেষ করে তিনি বাংলাদেশী রোগীদের চীনে চিকিৎসার সুযোগ সহজতর করার ও চীনের সহায়তায় নির্মিত হাসপাতাল প্রকল্পগুলোর প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয়ার অনুরোধ জানান। চীন এসব প্রস্তাবকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেছে। চীনের ইউনান প্রদেশের তিনটি শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল বিশেষভাবে বাংলাদেশী রোগীদের গ্রহণের জন্য নির্ধারণ হয়েছে। উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো মেডিকেল পরিষেবা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করছে, যার মধ্যে রয়েছে ভিসা প্রক্রিয়া সহজতর করা, চিকিৎসা প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা এবং অনুবাদ টিম গঠন করা। সবকিছু ঠিকভাবে চললে, প্রথম দফার বাংলাদেশী রোগীরা এ বছরের মার্চের মধ্যেই চীনে চিকিৎসা নিতে পারবেন।'
ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী চারটি হাসপাতাল ডেডিকেট করেছে চীন। সব হাসপাতালে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সব স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’