বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় জামায়াতের দুই কর্মীকে নৃশংসভাবে হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছে হেলমেট পরিহিত কয়েকজন যুবক।যদিও এরআগে ডাকাতির গুজব রটিয়ে তাদের উপর হামলার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও ফুটেজ 'দক্ষিণ-পূর্ব'র হাতে এসেছে। ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মারধরের একপর্যায়ে হেলমেট পরিহিত যুবকরা মাথায় হাতুড়ি দিয়ে উপুর্যুপরি আঘাত করে জামায়াতের কর্মী নেজাম উদ্দিন ও আবু ছালেহের মৃত্যু নিশ্চিত করছে। এরপর তারা ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ে৷
এই ঘটনায় নিহতরা হলেন উপজেলার কাঞ্চনা ইউনিয়নের মধ্যম কাঞ্চনা এলাকার মাহমুদুল হকের পুত্র মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন (৪৫) ও একই ইউনিয়নের গুরগুরি এলাকার আবদুর রহমানের পুত্র মোহাম্মদ ছালেক (৩৫)।তারা চট্টগ্রাম শহরের ব্যবসায়ী।অভিযোগ ওঠেছে, জামায়াতের এই কর্মীদেরকে হত্যার ছক হিসেবে ডাকাতির নামে গণপিটুনির পরিবেশ তৈরি করেছে খুনীরা। এই ঘটনায় স্থানীয় সদ্য বরখাস্তকৃত আওয়ামী চেয়ারম্যান মানিকের ভাই মমতাজ এবং হারুনও জড়িত রয়েছেন।
জানা যায়, নিজামুদ্দিন ও আবু ছালেক -দু'জনই জামায়াতের কর্মী। এরমধ্যে ছালেক নেজাম উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ অনুসারী। নিজামুদ্দিন দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। জামাতের কোন পদ পদবীতে না থাকলেও এলাকায় তিনি জামায়াতের 'নেতা' বলে পরিচিত। এরমধ্যে ৫ আগস্ট পর কাঞ্চনাসহ কয়েকটি ইউনিয়নে তার বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠে। সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে তাকে কয়েকবার সতর্কও কর হয়।।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোমবার রাতে নিহত নেজামকে একটি পক্ষ বিরোধ মীমাংসার কথা বলে ছনখোলা এলাকায় ডেকে নিয়ে যায়। নেজাম তাঁর ১৮-২০ জন অনুসারী নিয়ে সেখানে আসতেই মাইকের ডাকাত পড়েছে ঘোষণা দিয়ে দেয়া হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় দেড় থেকে দুই শতাধিক মানু্ষ রাস্তায় নেমে আসেন।এতে দু'পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।ওই সময় শতাধিক রাউন্ড গুলিও ছোড়া হয়।একপর্যায়ে নেজাম ও তার সহযোগী ছালেককে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় আরও ছয়জন গুলিবিদ্ধ হয়।এদের মধ্যে দুইজন নেজামের সহযোগী ছিলেন।
নিহতদের লাশের সাথে চমেক হাসপাতালে আসা হাশেম খান বলেন, তাদেরকে কেন হত্যা করা হয়েছে জানি না। তারা ভালো মানুষ ছিলেন। তাদেরকে হত্যার খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে আসি। সেখানে ডাকাতির কোন ঘটনা ঘটেনি। সম্পূর্ণ গুজব বিষয়টি। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
স্থানীয় নুর উদ্দিন বলেন, নেজাম উদ্দিন কোন ডাকাতির সাথে জড়িত নয়। তিনি খুব ভালো মানুষ। দীর্ঘ দিন এলাকায় আসতে পারেননি আওয়ামী লীগের নির্যাতনের কারণে।
এদিকে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছেন,নিহত এই দুই জামায়াত কর্মী জুলাই বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের ফেসবুক আইডিতে আন্দোলনে অংশগ্রহণের অসংখ্য ভিডিও এবং ছবি দেখা পাওয়া গেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রামের দামপাড়া এলাকায় ছাত্র জনতার মিছিলে অংশ নিয়েছেন তারা। আর নিজের মুঠো ফোনে ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করেছেন। ভিডিওতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা খান তালাত মাহমুদ রাফি ও চট্টগ্রামের সমন্বয়কদের দেখা গেছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি তারেক হোসাইন দক্ষিণ - পূর্বকে বলেন, নিহতরা আমাদের কর্মী।তাদেরকে একটি সালিশে অংশগ্রহণের কথা বলে ডেকে এনে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।এই ঘটনায় আমরা আইনের আশ্রয় নিবো।
তবে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের একজন নেতা নাম প্রকাশ করার শর্তে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, নিহতরা জামায়াতের লিস্টেড কোন কর্মী নন।তারা সংগঠনের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়েছিলেন।এই নিয়ে গত মঙ্গলবারও নিহত নেজামকে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে।যদিও নিহতরা দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ বলে জানিয়েছেন এই নেতা।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের ১২ ঘন্টা পার হলেও পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেপ্তার পারেনি। দায়ের করা হয়নি মামলা। একইসাথে দুই কর্মীকে হত্যার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সাতকানিয়া জামায়াতের নেতাকর্মীরা।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু ও সাতকানিয়া থানার ওসি মোঃ জাহিদুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন কল করা হলেও তারা সাড়া দেননি। পরে জানতে চাইলে সাতকানিয়া থানার ওসি তদন্ত সুদীপ্ত রেজা বলেন, ডাবল মার্ডারের ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। খুব দ্রুত ভুক্তভোগীদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। তবে এখনও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। ঘটনাটি কি আসলে ডাকাতির নাকি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড - সেটা এখনই বলতে পারছি না। যেহেতু মামলা তদন্তাধীন, তাই তদন্ত করে বলতে হবে।