আহনাফ হাসান
বহদ্দারহাটের গলিপথ ধরে ছুটছে একরাশ শঙ্কা আর শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা বুকে নিয়ে হাজারো ছাত্র-জনতা। সময়টা ১৮ জুলাইয়ের বিকেল। চারদিক থেকে ধেয়ে আসছে দমন-পীড়নের করাল ছায়া। দুদিকে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের গুণ্ডাবাহিনী, অন্য দুদিকে পুলিশ। তাদের হাতে বন্দুক, রামদা আর চোখে হিংস্রতা।তবু থেমে নেই জনতার মিছিল। যে মিছিলের ভিড়ে ছিলেন শাহীনও।
শাহীন,বয়স মাত্র পঁচিশ।ছাত্রদলের এক নিবেদিত প্রাণ কর্মী।তার শরীর জুড়ে গাঢ় হয়ে আছে আন্দোলনের আঁচড়। যে দেশে স্বপ্ন দেখা দায়, সেখানে দাঁড়িয়ে শাহীন দেখেছে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বড় ভাইয়ের পা হারানো। দেখেছে পুলিশের বারবার অভিযানে কেঁপে ওঠা সংসার। সেই অভিজ্ঞতাই তার ভেতরে জন্ম দিয়েছিল এক অবিনাশী জেদ। আর সেই জেদই তাকে টেনে এনেছিল রাজপথে—মুক্তির নামে, ন্যায়ের দাবিতে।
১৫ জুলাই, ঢাকায় ছাত্রদের ওপর ছাত্রলীগের বর্বর হামলার প্রতিবাদে শাহীন ও তার ভাই ফাহিম এলাকায় তরুণদের নিয়ে বের করেছিলেন মিছিল-পলিটেকনিক মোড়ে। রক্তে লেখা সেই রাতের প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ তৎপর হয়। রাতেই গিয়ে হাজির হয় তাদের বায়েজিদের বাসায়। হুমকি-ভাইদের একজনকে ধরিয়ে দাও, নয়তো গোটা পরিবার বিপদে পড়বে। সেদিন কোনোমতে পালিয়ে যান তারা। আর বাড়িমুখো হওয়া হয়নি।আত্মীয়ের বাড়িতে রাত, দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মিছিল—এই ছিল তখনকার জীবনচিত্র।
শাহীনের ভাইয়েরা পরদিন কোথায় কর্মসূচি, তা জানতে প্রতিদিন চোখ রাখতেন ‘খান তালাত মাহমুদ রাফি’র ফেসবুক পেজে। সেখান থেকেই সংগ্রহ করতেন আন্দোলনের দিকনির্দেশনা।
১৮ জুলাই সকালে শাহ আমানত সেতুর সংযোগস্থলে সংঘর্ষ হয় ছাত্রজনতা ও পুলিশ-ছাত্রলীগের মধ্যে। সেখান থেকে ধাওয়া খেয়ে শাহীনরা সরে আসেন বহদ্দারহাটে। এখানে জড়ো হয় নতুন করে মানুষ। কিন্তু প্রতিপক্ষও প্রস্তুত ছিল—সশস্ত্র, নিষ্ঠুর। এক পর্যায়ে গর্জে ওঠে গুলি। মুহূর্তেই রক্তে রাঙানো হয় মাটি।
শাহীন বলেন,'আমার পেটে গুলি লাগে। গলগল করে রক্ত পড়তে থাকে। কিন্তু হাসপাতালেও যেতে পারিনি—কারণ জানতাম, চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাতা ছিল হাসিনার পেটোয়াবাহিনীর ফাঁদ। আমাকে গ্রেপ্তার করতেই ওরা ওঁত পেতে বসেছিল।'
অগত্যা, বায়েজিদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গোপনে অস্ত্রোপচার হয়। কিন্তু সেখানেও বেশিক্ষণ থাকা গেল না। গুলি খাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ফের পালিয়ে বেড়াতে হয়। লুকিয়ে লুকিয়ে সুস্থ হন। এবং আগস্টের শুরুতেই আবার ফিরেও আসেন রাজপথে-এক নতুন প্রতিজ্ঞা নিয়ে।
৪ আগস্ট, নিউমার্কেট মোড়ে আবারও দানবীয় আক্রমণ। পুলিশ-আওয়ামী লীগের গুলি এবার শাহীনের ভাই ফাহিমকে বিদ্ধ করে। তাকেও গোপনে নিয়ে যাওয়া হয় একই হাসপাতালে। ওই দুঃসময়ের কথা বলতে গিয়ে শাহীন বারবার ফিরে যান পরিবারের কথা, বিশেষত মায়ের কথা।
শাহীন বলেন, 'আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন মা। তিনি কোনোদিন আমাদের ঠেকাননি। উল্টো প্রতিদিন ভোরে উঠে কেঁদে কেঁদে দোয়া পড়তেন-আল্লাহ যেন আমাদের হেফাজত করেন। তার সাহস না থাকলে এত দূর আসা যেত না।”
শাহীন জানতেন, এই রক্তাক্ত পথই একদিন পৌঁছে দেবে বিজয়ে। তাঁর চোখে ছিল স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি, হৃদয়ে ছিল সাহসের ধ্বনি। গুলির ক্ষত, জেলখানার ভয় কিংবা প্রাণ হারানোর আশঙ্কা-কিছুই তাই তাকে দমাতে পারেনি। আর সেই কারণেই, ৫ আগস্ট দুপুর গড়াতেই যখন রাজপথে বিজয়ের শ্লোগান ওঠে, কাঁদেন শাহীন। কিন্তু এবার সে কান্না হয়ে ওঠলো-আনন্দাশ্রু।