দক্ষিণ পূর্ব

ড. ইউনূসের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি,কি পাচ্ছে বাংলাদেশ

sathi
sathi
প্রকাশ : ৬ জুন ২০২৫
পঠিত :
ড. ইউনূসের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি,কি পাচ্ছে বাংলাদেশ
তানজিম আনোয়ার

চব্বিশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর কুটনৈতিক সুনামকে কাজে লাগিয়ে এ দেশের মসৃণ এ পরিবর্তনের গতিশীলতাকে সামলে যাচ্ছেন নিপুণভাবে। তিনি তাঁর ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী কূটনীতি দিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে উন্মোচন করেছেন এক নতুন দিগন্ত । 

বিশ্লেষকরা একে বলছেন ‘৩৬০ ডিগ্রি কূটনীতি’, যেখানে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, সবদিকেই ছড়িয়েছে তাঁর কুটনৈতিক উদ্যোগ।

আগের ভারতকেন্দ্রিক বৈদেশিক নীতির ধারা থেকে সরে এসে ইউনূস প্রশাসন আস্থা ও নিরপেক্ষতাকে ভিত্তি করে গড়ে তুলছে নতুন এক কুটনৈতিক বাস্তবতা। 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের পর নতুন কোনো প্রশাসনের জন্য বৈদেশিক নীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হবে চ্যালেঞ্জিং। কারণ, তাঁর সময়কালের কুটনৈতিক কাঠামো ছিল প্রবলভাবে ভারত নির্ভর। 

কিন্তু নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূস সেই আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়ে তাঁর বৈশ্বিক খ্যাতি ও কুটনৈতিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে মসৃণ পরিবর্তনশীলতাকে সামলিয়ে পররাষ্ট্রনীতিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছেন।

গত ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ড. ইউনূস দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের কুটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। এর লক্ষ্য ছিল, দেশের অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীল রূপান্তর এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অঙ্গনে নতুন করে দৃঢ় অবস্থানে দাঁড় করানো।

বৃহত্তর এই কুটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে চারদিনের জাপান সফরে গেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে তিনি টোকিওতে অনুষ্ঠেয় ৩০তম নিক্কেই ফোরামে অংশ নেন।

অধ্যাপক ইউনূসের চীন সফরে যাওয়ার আগেই জাপান সফরসূচি ঠিক করা হয়েছিল। এমনটি করা হয়েছে, যাতে বোঝানো যায়, বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব বেড়ে গেলেও তাঁর সরকার সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে কূটনীতি করতে চায়।

দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং কৌশলগতভাবে পুনর্বিন্যস্ত বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়, ড. ইউনূসের পররাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্ট বার্তা দেয় যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গঠনমূলক এবং স্বাধীন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চায়।

বাইডেন থেকে শি জিনপিং, শি থেকে মোদি, আঞ্চলিক রাজধানী থেকে আন্তর্জাতিক ফোরাম সব দিকেই ইউনূসের কূটনীতির হাত প্রসারিত হয়েছে। ‘৩৬০ ডিগ্রি কূটনীতি’ বলতে বোঝানো হয় একটি পূর্ণাঙ্গ, সামগ্রিক ও সুষম পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে প্রতিটি দিক বিবেচনায় রাখা হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বহুমুখী কূটনীতি বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের কৌশলগত পুনর্বিন্যাসকে নির্দেশ করে। এর মাধ্যমে ঐতিহ্যগত মিত্রদের পাশাপাশি নতুন জোটও গড়ে তোলা হচ্ছে। যার লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে জাতীয় স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা।


প্রথম বড় কুটনৈতিক সাফল্য: সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের ক্ষমা

অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় শতাধিক বাংলাদেশি শ্রমিককে সাজার আদেশ দিয়েছিল দেশটির আদালত। তবে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সরাসরি আলোচনার পর তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এই ঘটনাকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, ‘এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।’ তৌহিদ হোসেন এই সাফল্যের কৃতিত্ব দেন অধ্যাপক ইউনূসের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও কৌশলী কূটনীতিকে। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেন যে এই বিক্ষোভ ছিল বাংলাদেশের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং কোনো বিদেশি সরকারের বিরুদ্ধে নয়।


পশ্চিমা বিশ্বে দৃঢ় বার্তা:

ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক কূটনীতিক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটান ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৭৯তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে, সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ  বৈঠক করেন। 

সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে আলোচনা হয় বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো জোরদার, গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে।

সঙ্গে বৈঠকের পর ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নেন ড. ইউনূস। সেখানে তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের মিত্র সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে উভয়েই সামাজিক ব্যবসা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর ২৬ সেপ্টেম্বর একদিনেই ১৬টি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

সেদিন তিনি পাকিস্তান, কানাডা ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী, ব্রাজিল ও মরিশাসের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ভল্কার তুর্কের সঙ্গে বৈঠক করেন।

জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার। তিনি জানান, নতুন বাংলাদেশ সকল নাগরিকের জন্য স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠান যা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের প্রতি অন্যতম প্রধান একটি পশ্চিমা রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সমর্থন নিশ্চিত করে।

ব্রিটিশ প্রতিনিধিদল জানায়, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের প্রতি তাদের অব্যাহত সমর্থন বজায় রাখবে। দলটি ঢাকার সাথে ব্রেক্সিট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরো গভীর করতে লন্ডনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।

আন্তর্জাতিক সমর্থনের সূচনা: মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফর

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অক্টোবরের শুরুতে প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ঢাকা সফর করেন। এটি বহির্বিশ্বে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি দৃঢ় সমর্থনের বার্তা দেয়। 

গত বছর ৪ অক্টোবর ৫৮ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় আসেন আনোয়ার ইব্রাহিম। দলটিতে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প, পররাষ্ট্র, পরিবহণ এবং ধর্মবিষয়ক উপমন্ত্রীসহ সংসদ সদস্যরাও ছিলেন। এ সফর ছিল মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে ইউনূস সরকারের প্রতি শক্ত কুটনৈতিক সমর্থনের প্রতিফলন।


চার দশকের বেশি সময় ধরে অধ্যাপক ইউনূসের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত আনোয়ার ইব্রাহিম। এবারের সফরেও গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতি ইউনূসের অবিচল অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন তিনি। আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, বাংলাদেশকে আরো বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অধিকারভিত্তিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইউনূসের সক্ষমতার ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা আছে।

দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে (ড. ইউনূস) চিনি। আমি জানি, আপনি নারী-পুরুষের জীবন, মানবাধিকার ও মর্যাদার জন্য কতটা নিবেদিত। আপনার অবস্থানকে পুরোপুরি সমর্থন জানাই।’

এর দুই মাস পর, তিমুর লেস্তের প্রেসিডেন্ট রামোস-হোর্তা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেন এবং বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন।

আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও এই সফরের তাৎপর্য ছিল গভীর। এটি মিয়ানমারে চলমান সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৌশলগত জোট গঠনের দিকে ঢাকার দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

এই সফরগুলোর কুটনৈতিক গুরুত্ব নিহিত আঞ্চলিক কৌশলগত হিসেব-নিকেশে। মিয়ানমারের ওপর আসিয়ানের বর্তমান চেয়ার হিসেবে মালয়েশিয়ার প্রভাব দিন দিন বাড়ছে এবং রোহিঙ্গা সংকটে নেপিডো’র ওপর চাপ সৃষ্টিতে এ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে আসিয়ানের পূর্ণ সদস্যপদ লাভের পথে থাকা টিমর-লেস্টে ভবিষ্যতে জোটটির অভ্যন্তরীণ গতিশীলতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে উঠে আসতে পারে। 

ঢাকায় ইউনূসের সঙ্গে ইইউ এর ২৭ রাষ্ট্রদূতের ঐতিহাসিক বৈঠক

নজিরবিহীন কুটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ঢাকা ও নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭ সদস্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত একযোগে বৈঠক করেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত ও ইইউ প্রতিনিধিদলের প্রধান মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা-ইইউ সম্পর্ককে আরো গভীর করতে জোটের সম্মিলিত প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন এই বৈঠক।


বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় এই বৈঠককে বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেন ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

যেখানে ঢাকায় মাত্র সাতজন ইইউ রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত আছেন, সেখানে নয়াদিল্লি থেকে ২০ জন রাষ্ট্রদূতের অংশগ্রহণ আয়োজনটিতে ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা যোগ করে।

এটি বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও বহুমাত্রিক সহযোগিতার প্রতি ইইউর আস্থা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার স্পষ্ট বার্তা বহন করে।

জলবায়ু কূটনীতিতে ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্ব:

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের নভেম্বরে আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত কোপ২৯ জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্ব ও টেকসই উন্নয়নের পক্ষে বৈশ্বিক কণ্ঠস্বর হিসেবে তাঁর অবস্থান আরো সুদৃঢ় করেন।

সম্মেলনে তিনি বিশ্ব নেতাদের সামনে একটি নতুন সাহসী বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন ‘থ্রি জিরো’ নামে। যার মূলনীতি হলো: শূন্য কার্বন নিঃসরণ, শূন্য দারিদ্র্য ও শূন্য বেকারত্ব।

বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের উদ্দেশে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ইউনূস বলেন, ‘তিনটি শূন্যের একটি নতুন পৃথিবী গড়ার বহুদিনের স্বপ্ন আমি এবার আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।’

তাঁর এই ভাষণ বিশ্বজুড়ে প্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে। ইউনূস বাংলাদেশকে কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবেই নয়, বরং বিশ্বের কাছে পথপ্রদর্শক  হিসেবেও উপস্থাপন করেন।

ভাষণের বাইরেও, ইউনূস সম্মেলনজুড়ে পূর্ণ মাত্রার কুটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। তিনি ২০টিরও বেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর মধ্যে ছিলেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং পাকিস্তান, ভূটান, নেপাল, মালদ্বীপ, বেলজিয়াম, ঘানার প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ পান এবং বাংলাদেশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় আঙ্কারার পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাসও লাভ করেন।

একই সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশসমূহ (এলডিসি) বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে দেখা করেন। পরে ড. ইউনূস সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, ব্রাজিলের ভাইস প্রেসিডেন্টের স্ত্রী লু আলকমিন এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও ফিফা প্রধানদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন।

সম্মেলনের ফাঁকে আয়োজিত তরুণদের এক সংলাপে ইউনূস তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা সাহস করে স্বপ্ন দেখো, তাহলে জীবনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যদি স্বপ্নই না দেখ, কিছুই ঘটবে না।’

দূরদর্শী নীতি, তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতায়ন এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে অধ্যাপক ইউনূস কপ২৯ সম্মেলনে এমন এক বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে এ দেশ জলবায়ু বিপর্যয়ের সম্মুখভাগে থাকার পাশাপাশি নৈতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক সংস্কারের চালকের ভূমিকাতেও অবতীর্ণ।

ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পথে এগুচ্ছে বাংলাদেশ:

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতাগুলো তাঁর ঘোষিত ৩৬০-ডিগ্রি কূটনীতিরই স্পষ্ট প্রতিফলন। যার লক্ষ্য বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অঙ্গনে গঠনমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি বড় পরাশক্তিদের সঙ্গে গঠনমূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়াতে চান অধ্যাপক ইউনূস।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. ইউনূসের এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন।

কোনো একক শক্তিশালী জোটের প্রতি পক্ষপাত না দেখিয়ে, কোনো দেশের অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্বের সব প্রধান শক্তি, আঞ্চলিক প্রতিবেশী এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে, যা ইতিবাচক।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা একে বলেন, ‘এটি সত্যিকারের ৩৬০-ডিগ্রি কূটনীতি।’ তাঁর ভাষায়, ‘ঢাকা এখন সবার সঙ্গে কথা বলছে, আবার নিজেদের স্বার্থও রক্ষা করছে। আমরা বিশ্বকে দেখাতে সক্ষম হয়েছি, বাংলাদেশ এখন একটি উন্মুক্ত, স্থিতিশীল এবং ভবিষ্যত প্রসারী রাষ্ট্র।’

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই কুটনৈতিক কৌশল অধ্যাপক ইউনূসের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিক নেতৃত্বেরই প্রতিফলন। তাঁর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও বিশ্বজোড়া পরিচিতির কারণে আন্তর্জাতিক মহল বর্তমানে ঢাকার রূপান্তর পর্বের সঙ্গেও প্রকাশ্যে যোগাযোগে আগ্রহী।

মার্কিন কূটনীতিকদের ঢাকা সফর: অব্যাহত সম্পর্কের বার্তা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রশাসন ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিকোল এ. চুলিক এবং অ্যান্ড্রু হ্যারাপ ঢাকা সফর করেন।

তাঁরা ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, শ্রম অধিকার এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও তৈরি পোশাক খাতে মার্কিন বিনিয়োগ সম্প্রসারণ বিষয়ে আলোচনা করেন।

এই সফরের মাধ্যমে ওয়াশিংটন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে নিজেদের অব্যাহত সমর্থন ও ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে। মূলত এ সফর ছিল বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব দেওয়ারই স্পষ্ট বার্তা।

সংকটে বৈশ্বিক মনোযোগ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ:

ব্যাপক কুটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে অধ্যাপক ইউনূস দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের ওপর নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এই সংকট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জটিল, মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জও বটে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ), বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ), কপ২৯ ও বিভিন্ন বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠকেও তিনি বারবার মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন।

বিশ্লেষকেরাও বলছেন, ইউনূসের প্রচেষ্টায় বিষয়টি আবারও বৈশ্বিক আলোচনায় স্থান পেয়েছে এবং অনেক উন্নয়ন সহযোগী দেশও বাংলাদেশের মানবিক প্রচেষ্টায় নতুন করে সমর্থন জানিয়েছে।

অধ্যাপক ইউনূসের অনুরোধে জাতিসংঘ এ বছর নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি বৈশ্বিক সেমিনার আয়োজনে সম্মত হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো, রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরো ব্যাপকভাবে তুলে ধরা এবং টেকসই প্রত্যাবাসন ও দায়িত্ব ভাগাভাগির জন্য রোডম্যাপ নির্ধারণ করা।

ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই সেমিনার হবে বৈশ্বিক সংহতি পুনরায় নিশ্চিত, আন্তর্জাতিক সহায়তা আহ্বান এবং কূটনৈতিকভাবে নতুন সমাধানের পথ খোঁজার পথে গুরুত্বপূর্ণ এক মঞ্চ।

লিখা: বাসস থেকে সংগৃহীত ও পরিমার্জিত

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।