আহনাফ হাসান
ইমরান খান থেকে অর্জুনা রানাতুঙ্গা, নভজ্যোত সিং সিধু থেকে মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান—
বাইশ গজের উত্তাল মাঠে ব্যাট-বলের মায়াজালে কোটি ভক্তকে আপন করে নেওয়া এই ক্রিকেটারদের কেউ জাতিকে এনে দিয়েছেন বিশ্বকাপের গৌরবময় ট্রফি, কেউ বা নেতৃত্বে দিয়েছেন দেশকে। তবে তাঁদের পরিচয় থেমে থাকেনি কেবল 'ক্রিকেটার' শব্দে। রাজনীতির মাঠেও দীপ্ত পদচিহ্ন রেখে সময়ের পরিক্রমায় তাঁরা হয়ে উঠেছেন রাষ্ট্রনায়ক কিংবা সংসদ সদস্য।
ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠার সেই ছোট্ট তালিকায় কি এবার যুক্ত হতে চলেছে—তামিম ইকবালের নামও? ক্রিকেট ব্যাট চিরদিনের জন্য তুলে রাখা খান সাহেব কি এবার নামছেন দেশ সেবার ব্যাট হাতে!
যদিও এই সাবেক অধিনায়ক এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতির ইনিংস শুরু করেননি, তবে সম্প্রতি চট্টগ্রামে বিএনপির এক যুব সমাবেশে উপস্থিত থেকে যেন বার্তা দিয়ে দিলেন, 'প্রিয় দেশবাসী আমিও আসছি আপনাদের দুয়ারে!'
অবশ্য বিএনপির কোনো পদে নেই তামিম। তবে বহু আগে থেকেই তাঁর পরিবার অনেকটা বিএনপি-ঘেঁষা! এক যুগ আগে তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতি সেই পরিচিতিতে যেন সিলমোহর দিয়েছিলো। যদিও এরপর বিএনপির কোনো কিছুতে কখনো দেখা যায়নি তামিমকে। তবে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন দেশের ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পর অবসর নেওয়ার কিছু মাসের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যাওয়া জাতীয় পর্যায়ে
ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। গুঞ্জন উঠেছে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির হয়ে অংশ নিতে পারেন তামিম। চট্টগ্রাম-৯ ও চট্টগ্রাম-১০, এই দুই আসনের কোনো একটিতে নির্বাচনে মাঠে দাঁড়াতে পারেন তামিম। যদিও 'রাজনীতিবিমূখ' তামিম আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেননি। বিএনপির পক্ষ থেকেও তাকে নিয়ে এখনো স্বচ্ছ কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। এরপরও তামিম যতই সমাবেশে যোগ দিয়ে 'আমি একজন খেলোয়াড়, পলিটিক্যাল কেউ নই'-বলুন না কেন, সময়ের স্রোত যেন ইঙ্গিত দিয়ে দিলো মাশরাফি- সাকিবের পর এবার অদূর ভবিষ্যতে তামিম খেল দেখাবে রাজনীতি মাঠে!
তামিম ইকবাল দেশের সর্বকালের জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের একজন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মানুষের বড় আবেগের ঠিকানা। কেননা, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু- আকরাম খানের পর বলতে গেলে চট্টগ্রামের ক্রিকেট পতাকাটা ষোল বছর ধরে একাই উড়িয়ে গেছেন তামিম। অবশ্য তার আগে আফতাব আহমেদ, নাফিস ইকবাল, নাজিম উদ্দিনের ব্যাটের ফল্গুধারায় অনেকবারই হাসি ফুটেছে চট্টগ্রামের মানুষদের মুখে। কিন্তু সেই হাসির স্থায়ীত্ব ছিল-ক্ষণস্থায়ীই!
সেই দিক দিয়ে লম্বা সময় তামিমের ব্যাটিংয়েই ধন্য হয়েছেন চট্টগ্রামের মানুষ। তামিমের পর এই শহরের নাঈম হাসান, ইয়াসির আলী রাব্বীরা জাতীয় দলে সুযোগ পেলেও এখনো পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে পারেনি। এর পেছনে চট্টগ্রামকে 'বঞ্চিত' করার অভিযোগও বহুদিনের। এসব বিবেচনায় তরুণদের একটা অংশ মনে করেন চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনকে অতীতের আভিজাত্যে ফিরিয়ে নিতে পারবেন শুধু একজনই, তামিম ইকবাল। আর এটি রাজনীতির যোগ ছাড়া অসম্ভব।
তবে আরেকটা অংশ মনে করিয়ে দিলেন সাকিব-মাশরাফির 'পরিণতিও'!
তাঁরা বলছেন, তামিম সবার। ষড়যন্ত্র করে তামিমকে যখন অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছিলো, সেদিন তাঁর সঙ্গে কেঁদেছে পুরো চট্টগ্রাম। দলমত নির্বিশেষে জনপ্রিয় এমন একজন মহাতারকা একটি দলের হয়ে যাবেন, সেটি মানা যায় না। তামিমের যে গরিমা, তাতে কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত না হয়েও দেশের সেবা করতে পারবেন, করতে পারবেন ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন। সবচেয়ে বড় শঙ্কা, তামিমের মতো একজন ক্রীড়াবিদ রাজনীতিতে এসে তাঁরমূল পরিচিতি হারাবেন না তো?'
তবে তামিম ইকবালের ঘনিষ্ঠজনরা বলেছেন, এই মুহূর্তে রাজনীতি নয়, ক্রিকেট তথা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নইতামিমের অগ্রাধিকার। আর সেটি যে ব্যক্তি উদ্যোগে একেবারেই সম্ভব নয়, সেজন্য রাজনীতিকে হয়তো সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে চান সাবেক অধিনায়ক।
তামিমের ফুফা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক পরিচালক সিরাজ উদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরের কণ্ঠেও ছিল এমনই বার্তা। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, 'সমাবেশে যোগ দেওয়ার রাতেই তামিমের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।আলাপকালে বুঝেছি রাজনীতি নিয়ে তার আগ্রহ নেই।তার মননজুড়ে শুধুই ক্রিকেট।’
বিএনপির চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাফের্য়াস কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরুও মনে করিয়ে দিয়েছেন সমাবেশে যোগদানের সঙ্গে রাজনীতির কোনো যোগ নেই। তিনি বলেন,
বিএনপির ‘তারুণ্যের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সমাবেশে’ যোগ দিয়েছিলেন তামিম ইকবাল। তিনি একজন র্স্পোটসম্যান হিসেবেই সমাবেশে এসেছিলেন। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই।'
তবে বাস্তবতা হচ্ছে গত ১০ মে চট্টগ্রামে বিএনপির তিন সহযোগী সংগঠনের আয়োজনে ‘তারুণ্যের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সমাবেশ’-এ যোগ দেওয়া তামিম ইকবালকে দলের নেতারা উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরণ করে নেন।
বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মঞ্চের অগ্রভাগে ছিলেন তামিম। তামিমকে ঘিরে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে গেছে। আর দেশের মানুষের কাছে তামিমের বিপুল জনপ্রিয়তাকে হেলায় হারাবে কেন বিএনপি?
এখন তাই দেখার বিষয় মাশরাফি-সাকিবের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তামিম 'আসন্ন' সব সমালোচনা-বিতর্ককে বুক পেতে নিয়ে রাজনীতিতে নামবেন, নাকি বহুদিনের যত্নে গড়া পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিতে সব দলের, সব মতের, সব শ্রেণির মানুষের হৃদয়ের রাজা হয়ে রইবেন?
প্রশ্নটা তোলা রইলো ভবিষ্যতের কাছে...