নিজস্ব প্রতিবেদক
অভাব, অনটন আর দৈনিক দিনমজুরের জীবন যাদের, সেই ২২ জন হতদরিদ্র মানুষকে প্রতারণা করে তাদের নামে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে প্রায় আড়াইশো কোটি টাকার ঋণ তুলে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এই ভয়াবহ জালিয়াতির নেপথ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দিনমজুরদের অনেকেই জানেন না কীভাবে তারা এত বড় ঋণের জালে জড়িয়েছেন, আর এই মানসিক চাপে ইতোমধ্যে এক ভুক্তভোগী স্ট্রোক করে মারাও গেছেন।
প্রতারণার শিকার দিনমজুররা
কক্সবাজারের রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ির অন্তত ২২ জন দিনমজুর ও শ্রমিকের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। তাদের কারোর নামেই ৭ কোটি, কারোর নামে ১০ কোটি এবং সুদে-আসলে সেই ঋণের পরিমাণ এখন ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই টাকা জীবনে চোখেও দেখেননি তারা।
ভুক্তভোগীরা জানান, ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময়ে অনুদান বা চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নেওয়া হয়। এরপর চা-দোকান বা গোপন আস্তানায় নিয়ে তাদের থেকে সাদা ও নীল রঙের কাগজে সই নেওয়া হয়। তাদের বলা হয়েছিল, এটি একটি সরকারি প্রকল্পের সাহায্য। বিনিময়ে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু পরে তারা জানতে পারেন, তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল ব্যাংক ঋণের নথিপত্রে।
কক্সবাজারের ঈদগড়ের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম, যিনি একটি জীর্ণ ঘরে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে থাকেন, তার নামে ২১ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণের নোটিশ আসে। তিনি বলেন, “আমি কখনো ব্যাংকেই যাইনি। করোনার সময় অনুদান দেবে বলে আমার NID নিয়েছিল। এত টাকা ঋণ কিভাবে নিলাম, তা আমি জানি না।”
একইভাবে, গর্জনিয়ার মিজানুর রহমান নামের আরেক দিনমজুর কয়েক কোটি টাকার ঋণের নোটিশ পেয়ে স্ট্রোক করে মারা যান। এখন তার স্ত্রী তিন সন্তান নিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
মূল হোতা কে?
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এই বিশাল জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা হলেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। অভিযোগ উঠেছে, তিনি এই দরিদ্র মানুষদের ব্যবহার করে ঋণ নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন। তিনি নিজে সামনে না এসে একটি চক্রের মাধ্যমে এই কাজ করিয়েছেন। এই চক্রে থাকা ব্যাংক কর্মকর্তারাও তার ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে।
কক্সবাজারের রামু এলাকার আবুল কালাম এবং নাইক্ষ্যংছড়ির নুরুল বশর নামে দুই ব্যক্তি এই দরিদ্র মানুষদের কাছ থেকে স্বাক্ষর ও NID সংগ্রহ করতেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, তারা জাবেদের নির্দেশেই কাজ করতেন। পরে জানা যায়, এই দুজনও প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।
এই প্রতারক চক্রের সদস্যরা হলেন মোস্তফিজুর রহমান, শাহজাহান, ও নুরুল আনোয়ার। এদের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়ায় এবং তাদের অফিস ছিল নগরের নন্দনকানে। সম্প্রতি তারা সেই অফিস সরিয়ে তিন পোলের মাথা এলাকার বিঅ্যান্ডবি টাওয়ারে চলে গেছেন।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নীরবতা
ভুক্তভোগীরা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চট্টগ্রামের চকবাজার শাখা থেকে এই ঋণ নিয়েছেন বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। শাখা ব্যবস্থাপক এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি জানান, তারা কেবল হেড অফিসের নির্দেশনায় কাজ করেন। কিভাবে দিনমজুরদের নামে এত বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন পেল, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি ব্যাংক কর্মকর্তারা।
ব্যাংকিং আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট রমিজ আহমেদ এই ঘটনাকে “ভয়াবহ জালিয়াতি ও চরম অনিয়মের নজীর” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, এই জালিয়াতির জন্য ব্যাংকের সঙ্গে জড়িত একটি পুরো গ্রুপ দায়ী।
বর্তমানে অনেক ভুক্তভোগী ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, অনেকে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এই অসহায় মানুষগুলো এখন আইনের সহায়তা ও সুবিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
ইই