দক্ষিণপূর্ব ডেস্ক
দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্রেশনে ভুগলে শুধু মন নয়, মস্তিষ্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন গবেষকরা। আন্তর্জাতিক একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত নারীরা মাত্র দুই থেকে আড়াই মাস আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাও মনে রাখতে অসুবিধায় পড়েন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডিপ্রেশন আসলে একটি নিউরোবায়োলজিক্যাল অসুখ, যা মস্তিষ্কের গঠনকেও বদলে দেয়।
হিপোক্যাম্পাস সংকোচন: স্মৃতি দুর্বল হওয়ার মূল কারণ
১৯৯৯ সালে Proceedings of the National Academy of Sciences-এ প্রকাশিত মার্কিন গবেষক ইয়েভেট আই. শিলাইন-এর (Yvette I. Sheline) নেতৃত্বাধীন একটি গবেষণায় দেখা যায়, হতাশাগ্রস্ত নারীদের মস্তিষ্কে হিপোক্যাম্পাসের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে যায়।
হিপোক্যাম্পাস হলো মস্তিষ্কের স্মৃতি সংরক্ষণ ও নতুন তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার মূল কেন্দ্র। আকার ছোট হয়ে গেলে শর্ট-টার্ম মেমোরি বা স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী ডিপ্রেশনে শরীরে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। কর্টিসলের প্রভাবে হিপোক্যাম্পাসের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নিউরোনাল সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।
নারীরা বেশি ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরুষদেরও ডিপ্রেশনে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় নারীদের মস্তিষ্কে এই ক্ষয় তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা, হরমোনাল পরিবর্তন ও সাংস্কৃতিক চাপ নারীদের ঝুঁকি বাড়ায়।
সাম্প্রতিক গবেষণার নতুন তথ্য
এমআরআই পরীক্ষায় দেখা গেছে, চিকিৎসাহীন ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীদের হিপোক্যাম্পাস ভলিউম উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
যারা অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট গ্রহণ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে ক্ষয় তুলনামূলকভাবে কম।
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মস্তিষ্কে নতুন কোষ জন্মাতে সহায়তা করে (নিউরোজেনেসিস)।
বিশেষজ্ঞ মতামত
ঢাকার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আরিফুল ইসলাম বলেন, “ডিপ্রেশনকে শুধু মন খারাপ ভাবলে ভুল হবে। এটি মস্তিষ্কের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটায়। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে স্মৃতিশক্তি ক্ষয়ের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।”
মনোবিজ্ঞানী নুসরাত জামান বলেন, “নারীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বেশি হলেও অনেকেই চিকিৎসা নিতে দ্বিধা করেন। সামাজিক ট্যাবু ভাঙা জরুরি।”
তথ্যবক্স: ডিপ্রেশন ও স্মৃতিশক্তি
দীর্ঘমেয়াদি ডিপ্রেশনে আক্রান্তরা ৬০–৭২ দিনের ঘটনা মনে রাখতে অসুবিধায় পড়েন।এতে কর্টিসল হরমোন অতিরিক্ত নিঃসরণে হিপোক্যাম্পাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।নারীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে।চিকিৎসা ও নিয়মিত ব্যায়ামে মস্তিষ্ক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা থাকে।
জনস্বাস্থ্য গুরুত্ব
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষণ্নতা এখন শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ইস্যু। সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা, সামাজিক সহায়তা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—এই চারটি পদক্ষেপ নিলে ডিপ্রেশন ও স্মৃতিশক্তি ক্ষয়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ডিপ্রেশনকে আর ‘শুধু মানসিক সমস্যা’ বলা যাবে না। নারীদের মস্তিষ্কে এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব প্রতিরোধে এখনই স্বাস্থ্যনীতি ও সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।