দক্ষিণ পূর্ব

দুবাইয়ের কোম্পানিকে এনসিটি দিলে লাভ কার

sathi
sathi
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৫
পঠিত :
দুবাইয়ের কোম্পানিকে এনসিটি দিলে লাভ কার
মাসুদ আলম

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দর। এই বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল বা এনসিটির ব্যবস্থাপনা বিদেশি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হবে কি-না, তা নিয়ে চলছে এখন জোর বিতর্ক। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার।

সাইফ পাওয়ারটেকের সুবিধার বিষয়টি বাদ দিলেও বিএনপি, জামায়াতসহ অনেকগুলো রাজনৈতিক দল চায় না বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দরকে তুলে দিতে। এ বিষয়ে নানা যুক্তিও তুলে ধরেছেন বিএনপি-জামায়াত নেতারা।

এদিকে ‘বন্দর রক্ষা আন্দোলন’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ নিয়ে সাইফ পাওয়ারটেকের মালিক তরফদার রুহুল আমিনের কথোপকথন ও চ্যাট ভাইরাল হয়েছে। যেখানে বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়া হয় বন্দর অচল করে দিতে হবে বলেও শোনা যায়।

জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি বৃহত্তম ও সবচেয়ে আধুনিক। এখানে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী জাহাজ ভিড়তে পারে। স্বয়ংক্রিয় ক্রেনের সাহায্যে দ্রুতগতিতে কন্টেইনার ওঠানো-নামানো হয়। গত বছরও এটি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডেল করেছে।

সরকার বলছে, সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং এতে বন্দরের কারও চাকরি সংক্রান্ত সমস্যা হবে না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন, নিউমুরিং টার্মিনাল ইতোমধ্যেই লাভজনক ও দক্ষতার সঙ্গে চলছে। 

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই টার্মিনাল থেকে এক হাজার ২১৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খরচ বাদ দিয়ে বন্দরের প্রকৃত আয় হয়েছিল ৫৭৪ কোটি টাকা। খরচের মধ্যে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং বাবদ সাইফ পাওয়ারটেক পেয়েছিল ৭৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

২০০৭ সাল থেকে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড টার্মিনালের দুটি জেটি অস্থায়ী ভিত্তিতে পরিচালনা করে আসছিল। ২০১৫ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সাইফ পাওয়ারটেককে চারটি জেটি পরিচালনায় নিয়োগ দেয়। সাইফ পাওয়ারটেকের কাজ পাওয়ার বিষয়টি তৎকালীন সরকারের 'স্বজনপ্রীতিমূলক' বলে মন্তব্য করেন বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের (বন্দর শাখা) সাবেক প্রচার সম্পাদক হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের উচিত প্রতিযোগিতামূলক স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে নতুন নতুন অপারেটর নিয়োগ দেওয়া।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বিদেশিদের পরিবর্তে দেশীয় অপারেটরের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার মতামত জানানো হয়েছে। গত ২০ এপ্রিল চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে দেশীয় অপারেটরের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার দাবি জানানো হয়। চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির শাহজাহান চৌধুরী বলেছিলেন, আমরা বিদেশি বিনিয়োগ চাই। কিন্তু সেই বিদেশি বিনিয়োগ হবে গ্রীণ ফিল্ডে। আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করা এনসিটি কেন বিদেশিদের দেওয়া হবে, তা বোধগম্য নয়।

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ ইতিবাচক। বড় কোনো কাজের জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে এনসিটি পরিচালনার মতো ছোট বিনিয়োগে বিদেশি অপারেটর প্রয়োজন আছে কি-না প্রশ্ন আছে। আমরা মনে করছি, দক্ষ দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনা করা যায়।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বলেছেন, গৃহযুদ্ধকবলিত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জন্য ‘মানবিক করিডোর’ দেওয়া এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ নয়। এই সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় সংসদ।

তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভাষ্য, বাংলাদেশের অর্থনীতি বদলাতে হলে চট্টগ্রাম বন্দরই একমাত্র ভরসা। চট্টগ্রাম বন্দরকে সত্যিকার বন্দরে পরিণত করার কাজ চলছে। যারা বন্দরের ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ, পৃথিবীর সেরা যারা, তাদের দিয়ে এই কাজ করাতে হবে, যেভাবেই হোক। মানুষ যদি রাজি না হয়, জোরাজুরি নয়, রাজি করিয়েই করতে হবে।

গত ৮ মে সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়ার চর, বে-টার্মিনাল ও বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল এলাকা পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, ‘পিপিপির আওতায় লালদিয়ার চরে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ৬০ থেকে ৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। সাগর উপকূলে বে-টার্মিনাল প্রকল্পে সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল এবং আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড ১ বিলিয়ন করে ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করবে। বন্দরে পুরোদমে চালু থাকা নিউমুরিং টার্মিনালেও বিদেশি বিনিয়োগ হবে।’

আশিক চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনের অঞ্চল করতে হলে বন্দর-সুবিধা অনেক বাড়াতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ হলে বন্দরের দক্ষতা বাড়বে। এ জন্য দেশীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।’

এরপর গত ১৪ মে বুধবার সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দরে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ইয়ার্ড-৫ পরিদর্শন করেন অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি বদলাতে হলে চট্টগ্রাম বন্দরই একমাত্র ভরসা। চট্টগ্রাম বন্দরকে সত্যিকার বন্দরে পরিণত করার কাজ চলছে। কাজেই আমরা বললাম, পৃথিবীর সেরা বন্দর ব্যবস্থাপক যারা আছে, তাদের ডাকো। দেখলাম যে আগেই ডাকা হয়েছে; কিন্তু কাজটা হচ্ছে না। বারবার সবার কাছে আবেদন করছি, এটা তাড়াতাড়ি করে দাও। যতই দিন যাবে, এই হৃৎপিণ্ডকে আর ওইভাবে স্থাপন করতে পারব না। এটা পরিবর্তন না করে বাংলাদেশে অর্থনীতি পরিবর্তন সম্ভব নয়।’

চট্টগ্রাম বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম বলেন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য বিদেশি বিনিয়োগ সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। লালদিয়ার চর, বে-টার্মিনালে বিদেশি বিনিয়োগের যে প্রক্রিয়া চলছে, সেগুলো ভালো সিদ্ধান্তের উদাহরণ। কারণ, বন্দরের কোনো অবকাঠামো নেই সেখানে। তবে নিউমুরিং টার্মিনালের প্রেক্ষাপট পুরো ভিন্ন। এখানে যেহেতু বন্দরের সব অবকাঠামো আছে, টার্মিনালটিও ভালোভাবে চলছে। তাই এ টার্মিনাল দেশীয় প্রতিষ্ঠান দিয়েই চালানো উচিত।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।