দক্ষিণ পূর্ব

ধানের শীষের হেভিওয়েট প্রার্থী বনাম জামায়াতের চ্যালেঞ্জার

Jalal Rumi
Jalal Rumi
প্রকাশ : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পঠিত :
ধানের শীষের হেভিওয়েট প্রার্থী বনাম জামায়াতের চ্যালেঞ্জার

ছবি: দক্ষিণপূর্ব

চট্টগ্রাম বন্দর—দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সেই বন্দরকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ও শিল্পাঞ্চল নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১১ সংসদীয় আসন বরাবরের মতোই এবারও জাতীয় রাজনীতিতে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকা এ আসন ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

রাজনৈতিক ইতিহাসেও আসনটি বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন। একসময় এ আসন থেকেই সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একাধিকবার নির্বাচিত হয়ে আসনটিকে নিজের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে এটি দীর্ঘদিন ধরেই ‘খসরুর আসন’ হিসেবে পরিচিত।

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি এ আসনে দলের হেভিওয়েট নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে প্রার্থী করেছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী মনোনয়ন দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ শফিউল আলমকে। অভিজ্ঞ সাবেক মন্ত্রী বনাম তুলনামূলক নতুন মুখ—এই দ্বন্দ্ব ঘিরে ভোটারদের মধ্যে বাড়ছে কৌতূহল।

 

বন্দর, ইপিজেড, পতেঙ্গাসহ আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১১ আসনে চসিকের ১০টি ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত। এ আসনে ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি। ইপিজেড ও শিল্পাঞ্চল থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের বসবাস রয়েছে এখানে, যাদের ভোট ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

 

এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস হাউস, ইস্টার্ন রিফাইনারি, তেল শোধনাগার, নৌ ও বিমানবাহিনীর ঘাঁটি, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকায় এ আসনের দিকে নজর থাকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদেরও।

 

এই আসনে মোট সাতজন প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াইটি হচ্ছে ধানের শীষের আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল আলমের মধ্যে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির আবু তাহের, বাসদের নিজামুল হক কাদেরী এবং ইসলামিক ফ্রন্টের মুহাম্মদ আবু তাহেরও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

 

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম নেওয়া আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিচিতিও রয়েছে। নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ই তিনি জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। এরপর একের পর এক নির্বাচনে জয়ী হয়ে দায়িত্ব পালন করেন বাণিজ্যমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের।

 

দীর্ঘ বিরতির পর এবারের নির্বাচনে শুরু থেকেই মাঠে সক্রিয় রয়েছেন তিনি। প্রচারের ধরনেও এনেছেন ভিন্নতা। অলিগলি, বস্তি, কলোনি, বাজার—সবখানেই সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। তার সঙ্গে প্রচারে যুক্ত হয়েছেন পরিবারের সদস্যরাও। বিএনপি নেতাকর্মীদের ভাষ্য, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার প্রচার কার্যক্রম অনেক বেশি প্রাণবন্ত।

 

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান সাহেব চট্টগ্রামে এসে জনসভা করেছেন। লাখ, লাখ মানুষের সমাগম হয়েছে। বিএনপির প্রার্থীরা যেখানেই যাচ্ছেন, মানুষ নিজ থেকেই এগিয়ে আসছে। একধরনের জোয়ার দেখতে পাচ্ছি সর্বত্র। মানুষ বলছে, আমরা এবার ভোট দিতে চাই, গণতন্ত্র ফিরে পেতে চাই, আমরা ‍সুন্দরভাবে বাঁচতে চাই। চট্টগ্রামকে একটি পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চট্টগ্রামকে আরও শক্তিশালী করে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপ দেওয়া হবে।

 

অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল আলম স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত নাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করা শফিউল আলম ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয়। প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েই নিয়মিত গণসংযোগ ও পথসভা করে আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি।

 

প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতি, চাঁদাবাজি বন্ধ, যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসন এবং স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন জামায়াতের এ প্রার্থী। তার দাবি, দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ চট্টগ্রাম-১১ গড়াই তার লক্ষ্য।

 

শফিউল আলম বলেন, চট্টগ্রাম-১১ আসনের মানুষ পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে আছে। নির্বাচিত হলে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, সড়ক সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ট্রাফিক সিস্টেম, ওয়াসার সংযোগ, সুপেয় পানিসহ জনগণের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা পালন করা হবে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও দখলবাজদের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

 

হেভিওয়েট অভিজ্ঞতা বনাম নতুন চ্যালেঞ্জ—এই দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে চট্টগ্রাম-১১ আসনের দায়িত্ব, তা জানতে আগ্রহী পুরো নগরবাসী।

 

এমএইচএফ

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।