দক্ষিণ পূর্ব

নগর জীবনের আন্তঃসামাজিক সম্পর্ক : একাল-সেকাল

sathi
sathi
প্রকাশ : ২ অক্টোবর ২০২৫
পঠিত :
নগর জীবনের আন্তঃসামাজিক সম্পর্ক : একাল-সেকাল
মো. আবুল কালাম আজাদ

স্বাধীন বাংলাদেশের পাঁচ দশকের পথ পরিক্রমায় আমাদের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। পরিবর্তনের হাওয়ায় পাল তুলে গ্রাম ও শহরে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে আজ গ্রামও কিন্তু আর আক্ষরিক অর্থে আগের মতো সেই গ্রাম নেই। কেননা নগরায়ণের অনিবার্য স্পর্শে অনেক গ্রামই এখন এক একটি ছোট্ট শহর বা উপ-শহরে পরিণত হয়েছে। শান বাধানো ঘাটসহ খোলামেলা উঠান, পুকুর, সবজিবাগান পরিবেষ্টিত গ্রামের বাড়ির সেই ঐতিহ্যময় দৃশ্য ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। 

আমার জন্মস্থান হবিগঞ্জ জেলার ভাটি এলাকা আজমিরীগঞ্জের শিবপাশাসহ অন্যান্য গ্রামের যে চিত্র আমার শৈশব ও কৈশোরে দেখেছি তা এখন প্রায় হারানোর পথে। এখন গ্রামে অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, বিদ্যুৎ এসেছে, পিচ ঢালাই পথ হয়েছে কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে মায়া-মমতায় ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ বড় বড় শহরে বসবাস শুরু করে।

সরকারি-বেসরকারি চাকরি ও ব্যবসাকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা পরবর্তী এক দশকের মধ্যেই এক ব্যাপকসংখ্যক শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। ৭০ ও ৮০ এর দশকে গড়ে ওঠা শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণে যে চিত্র আমার সামনে ভেসে ওঠে তার সাথে বর্তমান তথা চলমান ২০২৫ সালের নগর-সমাজের বাস্তবতায় বিস্তর ফারাক রয়েছে। আমি নিজেও মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন সন্তান হিসেবে আমার ছেলেবেলায় ৭০-৮০ এর দশকে পারিবারিক-সামাজিক ক্ষেত্রে যে হৃদ্যত্যপূর্ণ পরিবেশ দেখেছি তা এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে বলা যায়। এখনকার জীবনধারা অনেকটাই যেন যান্ত্রিক; সমাজের বড় একটা অংশের কাছে কীভাবে রাতারাতি বড়লোক (ধনী) হয়ে যাওয়া যায় তা-ই শুধু জীবনের লক্ষ্য। আজকের দিনে চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই। শহরের আনাচে-কানাচে চোখ-ধাঁধানো বড় বড় দালানকোঠা, বড় বড় বিপণী বিতান, দামি দামি গাড়ি কোনোটারই অভাব নেই। কিন্তু ফিরে পাওয়া যায় না ভালোবাসার সেই মমতাময় সামাজিকবন্ধন। এ যেন রবীন্দ্রনাথের সে কথাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়-‘ইটের পরে ইট/মাঝে মানুষ কীট/নেইকো ভালোবাসা, নেইকো খেলা’। 

ইট-পাথরের কঠিন গাঁথুনির এই পাথুরে সমাজে মানুষের মনও যেন অনেক কঠিন হয়ে গেছে। অথচ মাত্র কয়েক দশক আগেও গ্রাম থেকে ছুটে আসা শহরের মানুষদের মাঝে গ্রামীণ সহজ-সরলতার একটা ছোঁয়া পাওয়া যেতো। আমার বাবা সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার সুবাদে ছেলেবেলার প্রায় পুরো সময়ই কেটেছে চট্টগ্রামের একটি সরকারি কলোনিতে। সরকারি কলোনিতে বসবাসরত সবাই সবাইকে এতো আপন ভাবতো যে তা এখনকার বাস্তবতায় তা কল্পনাও করা যায় না। আমার পাশের বাসার নানা-নানু, মামা-মামীকে এতোটাই আমরা আপন ভাবতাম যে, শৈশবের একটা সময় পর্যন্ত বুঝতেও পারিনি যে, তাদের সঙ্গে আমাদের  রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়তা নেই। একজন আরেকজনের বাসায় একান্ত আত্মীয়ের মতোই যেকোনো সময়ই যেতো-এতে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, ছিল না কোনো কৃত্রিমতা। ঈদের দিনে আমরা ছোটরা দলবেঁধে পাড়ার এ মাথা থেকে সে মাথা সবার বাসায় গিয়ে আগে আগে মুরুব্বীদেরকে সালাম করা, এরপর সেলামী নেয়া, সেমাই খাওয়া ইত্যাদি বিষয় খুব সহজ এবং স্বাভাবিক ছিল। কেউ এসএসসি/এইচএসসি বা অন্য কোনো বিশেষ পরীক্ষা দেয়ার আগে পাড়ার সব মুরুব্বীদের কাছে দোয়া নিত। আবার কেউ বোর্ডস্ট্যান্ডসহ অসাধারণ ফলাফল অর্জন করলে সবাই সে ছেলেটিকে দেখতে আসতো এবং আর্শীবাদ করতো। আমার এখনও ভেবে আনন্দ লাগে আমি যখন ১৯৯০ সালে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে লিখিত, মৌখিক ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যাই তখন পাড়ার সবাই একান্ত আত্মীয়ের মতোই খুব খুশি হয়েছিল এবং উৎসাহিত হয়ে আমাকে দেখতে আসতো এবং মনভরে দোয়া করতো। পাড়ার সকলের ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় আমার বাবা তখন এ উপলক্ষে বিশাল ভোজের আয়োজন করেন এবং সবাইকে নিমন্ত্রণ করেন । অথচ আজকের দিনে এমন অনেকেই তার ছাত্রজীবনে ও কর্মজীবনে সাফল্যের সাক্ষর রাখছে অথচ কেউ তার খবরও রাখে না। এমনকি একটি ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে অথচ পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী সে খবর জানেও না বা সে খবর রাখার প্রয়োজনও মনে করে না। 

আজকের সমাজের মানুষেরা খুব বেশি আত্মকেন্দ্রিক; প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, নিজের স্ত্রী-সন্তান ও পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটাতেই শুধু ভালোবাসে। পাড়া-প্রতিবেশীর খোঁজখবর আজ কেউ খুব একটা রাখে বলে দেখা যায় না। অথচ প্রতিবেশীর অধিকার ধর্মীয় দৃষ্টিতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘সে ব্যক্তি প্রকৃত বিশ্বাসী নয় যে, নিজে উদরপূর্তি করে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’

এখনকার দিনে আমরা অনেকেই সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক, ইন্টারনেট ব্রাউজিং বা টিভি দেখে অবসর সময় কাটাতেই বেশি স্বস্তি অনুভব করি; পারতপক্ষে প্রতিবেশীদের সঙ্গে তো মিশিই না বরং পারলে একে অপরকে এড়িয়ে চলি। এরও কারণ আছে ; বিরাজমান সামাজিক অস্থিরতায় আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এখন পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিচ্ছিন্নতা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যে, খুব কাছাকাছি বসবাস করেও আমাদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব অনেক বেশি। সামাজিক এই পরিবর্তনের কারণে আমাদের কোমলমতি শিশুরাও এখন নির্মল আনন্দের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের ছোটবেলায় আমরা যেভাবে এক পাড়া থেকে আরেক পাড়া ঘুরে বেড়িয়েছি, একসাথে ঘুড়ি উড়িয়েছি, ক্রিকেট খেলেছি, সাতচারা খেলেছি, গোল্লাছুট খেলেছি; কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এখনকার শিশুরা সে সুযোগ থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। কারণ, শিশুদের খেলার মাঠ নেই, নেই কোনো খোলামেলা জায়গা অথবা নেই সেই পরিবেশ যেখানে অভিভাবকরা নিশ্চিন্তমনে তাদের সন্তানদেরকে খেলাধুলার জন্য ছাড়তে পারবে।

ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এ সমাজে চরম ভোগবাদী মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে যেখানে প্রায় সবাই বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এ কারণে আন্তঃসামাজিক সম্পর্কের মধ্যেও যেন ফরমালিন মিশে গেছে। অথচ দরকার মায়া-মমতায় ঘেরা নির্মল ও সুন্দর একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যেখানে সবাই মিলেমিশে একাত্ম হয়ে থাকবে। মনের মণিকোঠায় লালিত এবং স্মৃতির আয়নায় প্রতিবিম্বিত এমন একটি প্রাণবন্ত সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন আমাকে প্রতিনিয়তই হাতছানি দিয়ে ডাকে।

লেখক: পিএইচডি গবেষক
ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি, ইউএসএ
ও সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।