দক্ষিণ পূর্ব

নিয়োগ বাণিজ্যের মধ্যস্থতায় চবি'র সাংবাদিক!

sathi
sathi
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৫
পঠিত :
নিয়োগ বাণিজ্যের মধ্যস্থতায় চবি'র সাংবাদিক!

ছবি : ইয়ামিন আফ্রিদি

নিজস্ব প্রতিবেদক 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ছাত্রদল সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিনের নিয়োগ-বাণিজ্যের দ্বন্দ্ব মীমাংসা করতে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে এবার এক ছাত্রদল কর্মীর বিরুদ্ধে। নিয়োগের জন্য টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার নারীর সঙ্গে আফ্রিদির কথপোকথনের কল রেকর্ড প্রকাশ পেয়েছে। 

অভিযুক্ত ছাত্রদল কর্মী আল ইয়ামিন আফ্রিদি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের  শিক্ষার্থী।ছাত্রদলের রাজনীতির পাশাপাশি তিনি  দৈনিক দিনকাল ও ইত্তেফাক পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন।শাখা  ছাত্রদল সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিনের গ্রুপের রাজনীতিও করেন তিনি।

জানা গেছে, গত ২৪ জুলাই সাবিনা ইয়াসমিন নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর ছাত্রদল নেতা আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে চেক আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ দেন, যেখানে তিনি জড়িত ছাত্রদল নেতা আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে তার তিন লাখ টাকার চেক আটকে রেখে চাঁদা দাবি করার কথা উল্লেখ করেন। অভিযোগ দেওয়ার পর ওই রাতেই দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক দিনকালের চবি প্রতিনিধি আল ইয়ামিন আফ্রিদির মাধ্যমে ওই অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সাবিনা।

এ সংক্রান্ত ফাঁস হওয়া ফোনালাপে আফ্রিদিকে বলতে শোনা যায়, 'আপনারে (ভুক্তভোগী নারীকে উল্লেখ করে) লাস্ট বারের মত বলতেছি, অনুরোধ করতেছি আপনি চেক নিয়ে নেন এবং অভিযোগটা তুলে নেন। আপনি চেকটা পাইবেন না আর টাকাও তুলতে পারবেন না। হাবীব ভাই চেক প্রয়োজনে পুড়ায় ফেলবে, তাও দিবেনা। আপু আপনি ভুল কইরা ফালাইছেন (প্রক্টর অফিসে অভিযোগ দিয়ে) আবারও ভুল কইরেন না। এটা রিভেঞ্জ হয়ে গেছে। এখানে প্রিভেন্ট করার অনেক কিছু আছে।'

ফাঁস হওয়া কথোপকথনে আরও শোনা যায়, অভিযোগকারীর বাসায় চেক পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে তা পাওয়ার জন্য দুইটি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। প্রথমত ২০ হাজার টাকা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত প্রক্টর অফিসে গিয়ে লিখিত অভিযোগটি তুলে নিতে হবে।

আফ্রিদিকে বলতে শোনা যায়, 'আপনি যদি এখন হ্যাঁ বলেন আপনি চেকটা পাই যাবেন। আর না বললে হাবিব ভাই আর কখনই চেকটা ফেরত দিবে না। হাবিব ভাইয়েরা পলিটিক্যাল পারসন। এরা শুধু টাকা খাওয়ার ধান্দায় বইসা থাকে। এখন আমারে বলেন, হ্যাঁ বা না!'

ভুক্তভোগী সাবিনা ইয়াসমিন দক্ষিণপূর্বকে  জানান,হাবিব আমার চেক আটকে রাখার পর বিষয়টি নিয়ে আমি প্রক্টর অফিসে অভিযোগ করি।আমাকে সার্বিক কাজে দোলন নামে এক ছোট ভাই সহযোগিতা করে।একপর্যায়ে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে দোলনের ফোনে আমার সাথে কথা বলেন ইয়ামিন আফ্রিদি। সে আমাকে বলে এই বিষয়ে বাড়াবাড়ি  না করতে।

সাবিনা আরও বলেন,চেক আটকে রাখার অভিযোগটা প্রক্টর অফিসে দেওয়ার পর ওইদিন রাতে আমার স্থানীয় এক ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে হাবিব চেকটা আমার বাসায় পাঠায়। ওই সময় দুইটা শর্ত দেয় যে ২০ হাজার টাকা দিয়ে হাবিব থেকে চেকটা কিনে নিতে এবং প্রক্টর অফিসে গিয়ে বলতে আমি যে অভিযোগটা করেছি এটি মিথ্যা। এমনকি আমার কাছে যে চেক দিতে এসেছে তাও গোপন রাখতে বলে। আমি তখন জানিয়ে দিয়েছি, প্রক্টর অফিসে অভিযোগ দিয়েছি। এখন যা করার প্রক্টর স্যারেরা করবেন। চেক যদি নিতে হয় তবে প্রক্টর অফিস থেকে নিব। তখন আফ্রিদি আমাকে ফোনে হাবিবের পাঠানো চেক টা তাদের দেওয়া শর্ত মতো নিয়ে নিতে বলে। 

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে ইয়ামিন আফ্রিদি বলেন, গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত এক ছাত্রলীগ নেত্রী ও তার রেপিস্ট ছাত্রলীগ ক্যাডার ভাই ভিত্তিহীন মিথ্যা অভিযোগ করে। তবে প্রমাণহীনতার কারণে উক্ত অভিযোগের কোন সুরাহা হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে জামাত শিবিরের নিয়োগ বাণিজ্যের ২ টা সংবাদ প্রকাশ করার পর তাদের সেই শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। এরই প্রতিশোধস্পৃহা থেকে ক্যাম্পাসের জামাত শিবির ছাত্রদল নেতা হাবিবের বিরুদ্ধে হওয়া মিথ্যা অভিযোগে আমাকে মধ্যস্থতা করার মিথ্যা দায়ে হেনস্তা করার জন্য  নিউজ করার ভয় ভীতি দেখাচ্ছে। এবং একটি  বানোয়াট  অস্পষ্ট রেকর্ড দিয়ে আমাকে উক্ত মিথ্যা অভিযোগের মধ্যস্থতাকারী রূপে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, আমি এটি (রেকর্ড) ফরেনসিক তদন্তে পাঠানোর জন্যও চ্যালেঞ্জ করতে পরি, উক্ত রেকর্ডের ভয়েস আমার নয়। এই মেয়ের সাথে আমার এই বিষয়ে কেনো অন্য বিষয়েও সামনাসামনি তো দূরে থাক ফোনেও যোগাযোগ হয়নি। এমনকি উক্ত রেকর্ডের সাথে আমার সম্পৃক্ততা প্রমাণে আমি যে ফোন দিয়েছি তার কোন কল স্টোরি বা সাক্ষ্য প্রমাণও নেই। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নমান সহকারী মো. এমরান হোসেন। চাকরি দেওয়ার নাম করে বিশ্ববিদ্যালয়েরই বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিনা ইয়াসমিন থেকে নিয়েছেন ৫৮ লাখ টাকা। টাকা নিলেও চাকরি দিতে পারেননি এমরান। টাকাও ফেরত দেননি ইয়াসমিনের। এদিকে, টাকা উদ্ধারে সহযোগিতার আশ্বাস দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলকর্মী আহসান হাবিব। অন্যদিকে, প্রতারক এমরানের পক্ষ নিয়ে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেন চবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন। কিন্তু টাকা উদ্ধার করে না দিয়ে উল্টো ভুক্তভোগী ইয়াসমিনের তিন লাখ টাকার চেক নিয়ে গেছেন ছাত্রদলকর্মী হাবিব। চেক ফেরত না দিয়ে এখন দিচ্ছেন হুমকি। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাবেক উপাচার্য শিরীণ আখতারের সময় ১৫ জনকে চাকরির আশ্বাস দিয়ে ইয়াসমিন থেকে ৫৮ লাখ টাকা নগদ গ্রহণ করেন এমরান হোসাইন। কিন্তু যাওয়ায় আর চাকরি দিতে পারেননি। এরপর থেকেই টাকা ফেরত চেয়ে ঘুরছেন ইয়াসমিন। কিন্তু দুই বছর পার হলেও টাকা ফেরত পাননি তিনি। ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলকর্মী আহসান হাবিব টাকা পেতে সাহায্য করবেন বলে জানান। গত ৬ জানুয়ারি এমরান হাবিবের মধ্যস্থতায় ইয়াসমিনকে পাওনা টাকার ১০ লাখ টাকা প্রদান করবেন বলে জানান। সেদিন সন্ধ্যায় তাকে হাটহাজারীর একটি রেস্টুরেন্টে যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে দেখেন প্রতারক এমরানের হয়ে কথা বলতে এসেছেন চবি ছাত্রদল সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিনসহ ৩০-৪০ জন ছাত্রদলকর্মী। তারা টাকা কম নিতে চাপাচাপি করলে ইয়াসমিন সেখান থেকে চলে আসেন। এর কিছুদিন পর ছাত্রদল সভাপতি মহসিনসহ টাকা উদ্ধার করবে বলে জানালে ১৫ লাখ ও তিন লাখ টাকার দুটি চেক হাবিবকে দেন ইয়াসমিন। এরপর টাকা উদ্ধার না করে উল্টো যোগাযোগ বন্ধ করে দেন ছাত্রদলের এ কর্মী। পরে ১৫ লাখ টাকার চেক ফেরত দিলেও তিন লাখ টাকার চেক এখনও ফেরত দেননি তিনি। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী ইয়াসমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে একটি অভিযোগপত্র দিয়েছেন। তার অভিযোগের ভিত্তিতে কর্মচারী এমরানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী ইয়াসমিন বলেন, আমার টাকা ফিরিয়ে দেবে জানালে আমি দেখা করতে যাই। সেখানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আমাকে হুমকি ধমকি দেন। তারা জানান, আমার পাওনা টাকা তিন ভাগে ভাগ হবে। এক ভাগ আমি পাবো, বাকি অংশ অন্যদের মাঝে ভাগ হবে। আমি তাদের প্রস্তাবে রাজি হইনি। এরপর হাবিব টাকা উদ্ধার করবে বলে দুটো চেক নিলেও ৩ লাখ টাকার চ্যাক ফেরত দেয়নি। উল্টো প্রক্টর অফিসে অভিযোগ করার পর থেকে আমাকে বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে। 

অভিযুক্ত ছাত্রদলকর্মী আহসান হাবিব গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগ দেওয়া মেয়ের পরিবার আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত। তারা একটি নিয়োগের সিন্ডিকেট পরিচালনা করে। আমাকে এবং আমার সংগঠনের মানহানি করার জন্য সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ করেছে। আমি কোনভাবেই এগুলোর সাথে জড়িত নই। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় বোর্ড অব হেলথ এন্ড ডিসিপ্লিনারিতে বিষয়টি তোলা হবে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।