ঘরের মেঝে থেকে পানি উঠে এসেছে হাঁটু সমান। তারপর কোমর। তারপর বুক। কক্সবাজারের চকরিয়া, রামু, উখিয়া, টেকনাফ—পানি বাড়ছে আর মানুষের নিঃশ্বাস ছোট হচ্ছে।
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। তলিয়ে গেছে সড়ক, উপ-সড়ক, ঘরবাড়ি, ফসলী মাঠ। পানিবন্দি কয়েক লাখ মানুষ। চারদিকে শুধু থৈ থৈ পানি আর হাহাকার। ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। নৌকাডুবিতে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদ রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬২ জন। ৬৪০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই হয়েছে ১৪ হাজার ৬১ জনের।
সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা নগদ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংখ্যা দিয়ে কি পেটের খিদে, ভেজা কাপড় আর আতঙ্কের রাত মাপা যায়?
যে নৌকায় বাঁচার স্বপ্ন ছিল, সেখানেই শোক
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা। চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়ন। নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠেছিলেন আবদুল মালেকের তিন মেয়ে। মাঝপথে নৌকা ডুবে যায়।
পানিতে তলিয়ে যায় হাসনাতু জান্নাত, ১২ বছর। বড় বোন। ছোট দুই বোন জেরিন মনি ৮ ও শাওরিন মনি ৬ কে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। কক্সবাজারে ডুবুরি দল না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে আসা ডুবুরিরা হাসনাতুর মরদেহ উদ্ধার করেন।
চুলা ডুবেছে, খিদে ডুবেনি
চকরিয়া উপজেলার কাকরা ইউনিয়নের আহমেদুল হক বলেন, 'ঘরে চাল আছে, তরকারি আছে। কিন্তু রান্না করার জায়গা নাই। মাটির চুলা পানিতে ডুবে গেছে। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে ঠিকমতো খাইতে পারি নাই।'
এই দৃশ্য শুধু কাকরার নয়। সুরাজপুর-মানিকপুর, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী—বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে। গতকাল যেখানে হাঁটুপানি ছিল, আজ সেখানে কোমরপানি।
রামুর মিঠাছড়ির আবু হানিফ বলেন, 'বসতঘর আর রান্নাঘরে পানি। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে রান্না করতে পারি নাই। সরকার থেকে কিছু শুকনা খাবার দিয়ে গেছে।'

পানি শুধু মানুষকে তাড়ায়নি, তাড়িয়েছে গবাদিপশুকেও। বরইতলীর ডেইঙ্গাকাটার মোহাম্মদ আলী হোসেনের পাঁচটি গরু—এটাই তার একমাত্র সম্বল।
তিনি নৌকায় করে গরুগুলো সরিয়েছেন নিরাপদে। আর পরিবার নিয়ে উঠেছেন পাশের বাড়ির ছাদে। বরইতলী ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জমান জানান, ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত। বেশিরভাগ মানুষ এখনো পানিবন্দি।
চকরিয়া ইউএনও শাহীন দেলোয়ার জানান, উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি। বিভিন্ন এলাকায় শুকনা খাবার বিতরণ চলছে। মাতামুহুরী নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। নৌকাডুবির পরপরই ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার অভিযান চালায়।
রামু ইউএনও জিল্লুর রহমান বলেন, উপজেলার সব ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে গেছে। কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি। তাদের চাল, শুকনা খাবার ও নগদ টাকা দেওয়া হচ্ছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. শাহিদুল আলম জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নগদ টাকা ও চালের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। পানিবন্দি মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে আনার কাজ চলছে।
স্থানীয়রা বলছেন, কক্সবাজার জেলার অন্তত ৬০ শতাংশ এলাকা এখন পানির নিচে। মাইলের পর মাইল লোকালয় তলিয়েছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে উখিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, মহেশখালীসহ অর্ধশত ইউনিয়ন। রামুর গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাওয়ারখোপ, মিঠাছড়ি, ঈদগড়—একটি ইউনিয়নের অধিকাংশই এখন পানির রাজ্য।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র ও হিউম্যানেটেরিয়ান এক্টিভিস্ট শাহাদাত হোসাইন বলেন, 'কক্সবাজারের এবারের বন্যায় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মানুষ দীর্ঘদিন পানবন্দি। অপরিকল্পিত উন্নয়নও বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বাড়াচ্ছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন বন্যার জন্য ৭০ শতাংশ দায়ী। এই প্রকল্পের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল।
শাহাদাত হোসাইন আরও বলেন, স্থানীয় পানি হয়তো নামবে। কিন্তু যে শিশুটি ফিরবে না, যে চুলাটি আর জ্বলবে না, যে ফসলগুলো পচে যাবে—তার হিসাব কে রাখবে? বন্যা মানুষের ঘর কেড়ে নেয়। কিন্তু মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ালে, সেই ঘর আবার ওঠে। কক্সবাজারের মানুষ এখন শুধু সেই হাতটুকুর অপেক্ষায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ডাটা এন্টি অপারেটর হেফাজতুল ইসলাম বলেন, আমাদের বাড়ি চকরিয়া সদরে। ওই এলাকা পানিতে ডুবে আছে চার দিন। ফসলী জমি, মাছের প্রজেক্ট সব শেষ। মানুষ সাহায্যের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। সরকারি ও বেসরকারি সাহায্য এই মানবিক বিপর্যয় থেকে চকরিয়ার মানুষকে কিছুটা রক্ষা করতে পারবে।
এমএ