টানা বৃষ্টি। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তলিয়ে গেল চট্টগ্রামের দক্ষিণ। ঘর-বাড়ি, রাস্তা, ফসল—সব পানির নিচে।
এমন সংকটময় মুহূর্তে গ্রাম থেকে গ্রামে এখন শোনা যাচ্ছে আস্থার শব্দ—'সেনাবাহিনী এসেছে।'
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের জরুরি অনুরোধের প্রেক্ষিতে 'ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার'-এর আওতায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দায়িত্বে আছে ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন।
যেখানে পানি, সেখানেই সেনা নৌকা
লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী—এই চার উপজেলা ব্যাপকভাবে প্লাবিত। পানিবন্দি প্রায় ৪ লাখ মানুষ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, রান্নাঘর ডুবেছে, বিশুদ্ধ পানি নেই।
এই পরিস্থিতিতে ১০ পদাতিক ডিভিশন দুর্গত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে। রাবার বোট, লাইফ জ্যাকেট, প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে সেনাসদস্যরা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাচ্ছেন।
বৃদ্ধ, শিশু, অসুস্থ মানুষ—যারা পানির মধ্যে আটকে ছিলেন, তাদের কাঁধে করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসছেন তারা।
উত্তরে সহায়তায় নেমেছে ২৪ পদাতিক ডিভিশন
ভারী মৌসুমি বৃষ্টিতে বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতেও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। সেখানে দায়িত্ব নিয়েছে ২৪ পদাতিক ডিভিশন।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম দ্রুত ও সুশৃঙ্খল করতে তারা এরই মধ্যে বন্যাদুর্গত এলাকায় ৩টি ক্যাম্প স্থাপন করেছে। ক্যাম্পগুলো থেকে চলছে Search and Rescue - SAR অভিযান। একই সাথে শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও শিশুখাদ্য বিতরণ করা হচ্ছে।
একজন সেনা কর্মকর্তা বলেন, 'আমাদের প্রথম কাজ মানুষের জীবন বাঁচানো। এরপর তাদের পাশে দাঁড়ানো। যতক্ষণ না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, আমরা এখানেই থাকব।'
স্থানীয়রা বলছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বরাবরই দেশের যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেসামরিক প্রশাসনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে সমন্বয় করে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, রাস্তা-সেতু মেরামত, মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা—সবখানেই আছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
সাতকানিয়ার তরুণ মিজানুর রহমান বলেন, 'কাল রাত পর্যন্ত আমরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ সকালে সেনাবাহিনীর নৌকা এসে মা-বোনদের উদ্ধার করেছে। এরা না আসলে কী হতো জানি না।'
বাঁশখালী শেখের খীল ইউনিয়নের মোস্তাফিজ বলেন,
পাহাড়ি ঢল নেমে যাবে। পানি সরে যাবে। কিন্তু মানুষের মনে থেকে যাবে এই দিনগুলোর কথা—যখন বিপদের সময় সেনা ইউনিফর্ম পরা কিছু মানুষ নৌকা নিয়ে হাজির হয়েছিল আমাদের বাঁচাতে। বন্যা কেড়ে নিতে পারে ঘর। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি, সেটা কেড়ে নিতে পারে না।'
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দুর্গত এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
এমএ