দক্ষিণ পূর্ব

পানি সরে যাচ্ছে, রেখে যাচ্ছে কান্না আর ক্ষয়ক্ষতির গল্প

Riayad
Riayad
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬
পঠিত :
পানি সরে যাচ্ছে, রেখে যাচ্ছে কান্না আর ক্ষয়ক্ষতির গল্প

ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকাগুলো থেকে ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি। কোথাও এখনও কোমরসমান, কোথাও হাঁটুপানি। আর যেসব এলাকা পানিমুক্ত হচ্ছে, সেখানে একে একে সামনে আসছে ধসে পড়া ঘরবাড়ি, ভেঙে যাওয়া সড়ক, নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসল আর মানুষের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের ধ্বংসস্তূপ। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরেও স্বস্তি নেই অনেকের। নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে আবারও প্লাবিত হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটছে হাজারো পরিবারের।

 

বান্দরবানের শীলক খালের উত্তর পাড়ের বাসিন্দা শফিউল বারী এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না নিজের চোখকে। পাহাড়ি ঢলের পানি বাড়তে দেখে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘর ছেড়ে বের হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর বসতঘরটি স্রোতে ভেসে গিয়ে পাশের বেইলি সেতুর ওপর আছড়ে পড়ে। ঘরের সঙ্গে ভেসে যায় আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য এবং সারা জীবনের জমানো সহায়-সম্বল। একই এলাকার জেবেল মুল্লুকও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছেন। ফিরে এসে দেখেছেন, যেখানে ছিল বসতঘর, সেখানে এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ।

 

দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা বাঁশখালীতেও একই চিত্র। ছনুয়া এলাকার বাসিন্দা বেলাল বলেন, গত দুইদিন বৃষ্টি না হওয়ায় পানি কিছুটা কমেছে। তবে গ্রামীণ সড়কে এখনও হাঁটুপানি রয়েছে। ঘরে থাকার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। অন্যদিকে দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণও পৌঁছাচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণের বড় অংশ নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও ছনুয়া, খানখানাবাদ ও শীলকূপের মতো এলাকাগুলোতে এখনও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছেনি।

 

বাঁশখালীর কাথরিয়া ইউনিয়নের মধ্যম মানিকপাঠান গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে বন্যার ক্ষতচিহ্ন। অনেক বাড়ির মাটির দেয়ালের গোড়া নরম হয়ে গেছে, যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বীজাগার, বসতঘর ও গৃহস্থালির মালামাল।

 

গ্রামের বাসিন্দা আলী মিয়া বন্যার সময় সন্তানদের নিয়ে তিন কিলোমিটার দূরের বৈলছড়ি ইউনিয়নে শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পানি কমার খবর শুনে বাড়িতে ফিরে দেখেন, ঘরের দেয়াল এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে যে ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছেন না। একই গ্রামের পারভিন আক্তারের টিন ও মাটির তৈরি ঘরের দেয়ালও বন্যার পানিতে ধসে পড়েছে। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে কয়েকদিন আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার পরও এখনো নিজের বাড়িতে ফেরা সম্ভব হয়নি।

 

গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। বাঁশখালীর বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, কাথরিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের বড় অংশ পানির নিচে চলে যায়। আনোয়ারার রায়পুর, বারশত, পরৈকোড়া ও হাইলধর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাও প্লাবিত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে সাতকানিয়ার এওচিয়া, কেওচিয়া, ধর্মপুর, বাজালিয়াসহ ১৮টি ইউনিয়ন।

 

এদিকে পানি নামার পর ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম কিছুটা জোরদার হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগেও বন্যার্তদের মাঝে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়ন ফুটবল একাদশ ও এলাকাবাসীর সহায়তায় বাঁশখালীর খানখানাবাদ ইউনিয়নে ট্রাকভর্তি রান্না করা বিরানি, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি নিয়ে পৌঁছান। তাদের ভাষায়, “আমরা ত্রাণ দিতে নয়, বিপদে থাকা ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়াতে এসেছি।”

 

শুধু দক্ষিণ চট্টগ্রাম নয়, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসছে। কোথাও ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে, কোথাও ফসল নষ্ট হয়েছে। ভেসে গেছে মাছের ঘের ও পুকুর। পাহাড়ি ঢল ও বন্যার স্রোতে ভেঙে গেছে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট। অনেক এলাকায় পানি নেমে গেলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

 

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, জেলার প্রায় ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা। বান্দরবানে প্রায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ও চারটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জরুরি সংস্কারে প্রায় ৭ কোটি এবং টেকসই পুনর্নির্মাণে প্রায় ৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ।

 

দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় অন্তত ৩০ কিলোমিটার সড়ক ও ১৭টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঁশখালীতে প্রায় ১১০ কিলোমিটার সড়ক, ২৫টি কালভার্ট ও দুটি সেতু ক্ষতির মুখে পড়েছে। উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের হিসাবে, শুধু অবকাঠামো খাতেই সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

 

বন্যায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে। পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকেরা খেতে ফিরে দেখছেন, বিস্তীর্ণ জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কৃষকের প্রায় ৬০ কোটি টাকার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ৬২০টি পুকুর ও মাছের খামার ডুবে প্রায় ৮ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। প্রাণিসম্পদ খাতেও ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা।

 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা এখনো বন্যার প্রভাবে রয়েছে। বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত সাত জেলার ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনও ১০ হাজার ৮৫৪ জন মানুষ অবস্থান করছেন। যদিও বিভিন্ন এলাকায় পানি নামতে শুরু করেছে, তবে পুনর্বাসন, অবকাঠামো সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

আরএইচ/ দক্ষিণপূর্ব 

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।