আলমগীর মানিক, রাঙামাটি
আয়তন ও জনসংখ্যার তুলনায় নানান প্রেক্ষাপটে অনাদিকাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সীমিত সংখ্যায় গড়ে উঠেছে। পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার চাহিদা দিন দিন বাড়লেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা অবকাঠামো ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি আজও প্রকট। পার্বত্য চুক্তির পরবর্তী সময়ে সচেতন মানুষজন নিজস্ব উদ্যোগে কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও সেসব প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ এখনো সরকারি করণের আওতায় আসেনি। এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় আনা হয়নি, ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষাসামগ্রী ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনো আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ছোঁয়া লাগেনি। প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, তথ্যপ্রযুক্তি ল্যাব ও বিজ্ঞানাগারের অভাব শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় রাঙামাটির মাধ্যমিক লেভেলের প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী বঞ্চিত হচ্ছে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে।
বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত সুপ্রদীপ চাকমার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি দক্ষিণপূর্বকে জানান, পার্বত্য এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে অত্রাঞ্চলে কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিতে কাজ করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়। তারই ধারাবাহিকতায় আগামী ৫ মাসের মধ্যেই পার্বত্য এলাকায় অন্তত একশোটি স্কুলকে আমরা ডিজিটালাইজ করবো। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টাকে দিয়ে আমি এসব স্কুলগুলোকে ওপেন করাবো এবং প্রধান উপদেষ্টা নিজে উক্ত স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের সাথে প্রযুক্তির সহায়তায় সরাসরি কথা বলবেন। পাহাড়ে পড়ালেখার মান বাড়াতে তথা কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিতের লক্ষ্যেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদককে জানিয়েছেন পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডকে এখন থেকে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সময়োপযোগি প্রকল্প নেওয়ার জন্য বলে দিয়েছি।
পার্বত্য উপদেষ্টা মি. সুপ্রদীপ চাকমা প্রতিবেদককে বলেন, আমার নিজস্ব পরিকল্পনা হচ্ছে দূর্গম পাহাড়ে স্যাটেলাইট এডুকেশন সিস্টেম দাঁড় করিয়ে দেওয়া। আমরা জেলা- উপজেলা লেভেলে ২/৩টা করে আবাসিক হোস্টেল নির্মাণ করবো। সেগুলোতে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে থেকে তাদের পড়ালেখা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারে সে লক্ষ্যে কাজ করবো।
রাঙামাটি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজক চাকমা জানিয়েছেন, বর্তমানে আমাদের অধীনে বর্তমানে প্রায় ৮/১০টি প্রকল্প চলমান আছে। ইতোমধ্যেই চারতলা বিশিষ্ট্য ৭টি একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। চারটি শেষ করা হয়েছে বাকি তিনটি শেষের পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়াও পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ১০টি স্কুলের উর্দ্বমুখী সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এরবাইরেও মাদ্রাসা প্রকল্পের অধীনেও উন্নয়ন বাস্তবায়ন শেষের পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়াও রাজস্বখাতের মাধ্যমেও কিছু কিছু স্কুলের নতুন ভবন করা হচ্ছে। এরবাইরেও সরকার কর্তৃক কারিগরি শিক্ষার প্রসারে টেকনিক্যাল স্কুল সম্প্রসারণ প্রকল্পের অধীনে কাউখালীতে ভবন নির্মাণ কাজ চলছে এবং বেশ কয়েকটি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ভবন নির্মাণে জায়গা নির্ধারণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের রাঙামাটি জেলা শিক্ষা অফিসারের দায়িত্বে থাকা সরিৎ কুমার চাকমা জানিয়েছেন, জেলা শিক্ষা অফিসের অধীনে মাধ্যমিক পর্যায়ে ২৪৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলোতে প্রায় ৫০ হাজারের মতো শিক্ষা রয়েছে। তিনি বলেন, পাহাড়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে দুর্গম এলাকাগুলোর বিদ্যালয়গুলোতে আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রার্ন্তিক পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন করা প্রয়োজন। তাহলেই পাহাড়ের সর্বত্র শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব।
স্থানীয় সচেতনমহল মনে করছেন, পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হলে দ্রুত এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় আনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন জরুরি। অন্যথায় পাহাড়ের প্রজন্ম শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে, যা জাতীয় উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।