কালের বিবর্তনে মহাকালের গর্ভে বিলীন হলো আরও একটি বছর। বিদায়ী ২০২৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি সংখ্যা ছিল না, বরং এটি ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের বছর। ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের যে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল, গত এক বছরে আমরা তার প্রতিফলন দেখেছি। প্রাপ্তির ঝুলি যেমন কিছু ঐতিহাসিক অর্জনে সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পারদও আকাশচুম্বী হয়েছে। একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক দেশ গঠনের যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা নতুন বছরে পা দিচ্ছি, তার বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবি।
গত একটি বছর বাংলাদেশের জন্য ছিল ‘ভস্ম থেকে জেগে ওঠার’ মতো। দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর ভাঙনের পর দেশ পুনর্গঠনের কাজ ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। গত এক বছরের প্রধান প্রাপ্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের সূচনা: বিগত বছরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার সাহসী উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা ভাঙার জন্য সংস্কার কমিশনগুলোর কাজ ছিল চোখে পড়ার মতো। জনগণের মধ্যে এই আস্থা ফিরে এসেছে যে, রাষ্ট্র এখন সাধারণ মানুষের কথা শুনতে প্রস্তুত।
২. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার লড়াই: ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথে হাঁটা ছিল গত বছরের বড় সাফল্য। ডলার সংকট এবং মূল্যস্ফীতির প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও রিজার্ভের পতন ঠেকিয়ে রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহে গতিশীলতা ফেরার মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতির প্রতি তাদের আস্থা পুনস্থাপন করেছেন।
৩. আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির পুনরুদ্ধার: গত এক বছরে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার অঙ্গীকার এবং মানবাধিকার রক্ষায় আপসহীন মনোভাবের কারণে বিশ্বনেতাদের ইতিবাচক সমর্থন পেয়েছে বাংলাদেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়নসহ আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ কিন্তু শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে।
৪. তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব: ২০২৫ সাল ছিল তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের প্রদর্শনী। রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা কেবল রাজপথের নায়ক নয়, বরং ডিজিটাল বাংলাদেশ ২.০-এর স্থপতি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে।
প্রাপ্তির খতিয়ান যখন আমরা মেলাই, তখন কিছু অপূর্ণতা ও সীমাবদ্ধতাও আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়। সাধারণ মানুষ কেবল বড় বড় পরিসংখ্যানে সন্তুষ্ট থাকে না, তারা চায় জীবনের গুণগত মানোন্নয়ন। ২০২৬ সালে দেশের মানুষের প্রধান প্রত্যাশাগুলো হলো:-
১. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্বস্তি: সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা এখন বাজার দর। গত বছর মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগছে। নতুন বছরে মানুষের প্রত্যাশা হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যেন সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসে। বিশেষ করে সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত।
২. কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ: সংস্কারের এই আবহে নতুন বছরে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও সহজ করার প্রত্যাশা সবার। শিক্ষিত বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (SME) সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়াতে হবে।
৩. টেকসই নির্বাচনী রোডম্যাপ: গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রধান প্রত্যাশা হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। তবে সেই নির্বাচন যেন কেবল নামমাত্র না হয়, বরং তা যেন একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নতুন বছরে মানুষ একটি স্পষ্ট নির্বাচনী রোডম্যাপ দেখতে চায়।
৪. আইনের শাসন ও নিরাপত্তা: বিগত বছরে পুলিশি ব্যবস্থায় যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখতে চায় জনতা। রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা নতুন বছরের বড় দাবি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি পুরোপুরি উপড়ে ফেলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
৫. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গুণগত পরিবর্তন: শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। একই সাথে স্বাস্থ্যসেবা যেন বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বচ্ছতা এবং সেবার মান বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা।
প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার এই সমীকরণ মেলাতে গেলে দেখা যায়, আমরা একটি ট্রানজিশনাল পিরিয়ড বা রূপান্তরকালীন সময় পার করছি। সংস্কার প্রক্রিয়া যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি মানুষের ধৈর্যও সীমিত। সরকারের দায়িত্ব হবে সংস্কারের গতি বাড়ানো এবং জনগণের সাথে স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখা। অন্যদিকে, নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। কেবল সরকারের ওপর দোষারোপ না করে নাগরিক সচেতনতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া জরুরি। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকে সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিপ্লব কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের নাম নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গি ও অভ্যাসের পরিবর্তনের নাম।
নতুন বছর ২০২৬ আমাদের সামনে যেমন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, তেমনি নিয়ে এসেছে অপার সম্ভাবনা। গত বছরের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং প্রাপ্তিগুলোকে পুঁজি করে আমরা যদি এগিয়ে যাই, তবেই একটি 'নতুন বাংলাদেশ' গড়া সম্ভব হবে। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে যে ব্যবধান, তা ঘুচে যাক কর্মদক্ষতা আর দেশপ্রেমের সমন্বয়ে।
শুভ নববর্ষ, শুভ হোক বাংলাদেশের আগামী পথচলা।
জালাল উদ্দিন রুমি
সম্পাদক
দক্ষিণপূর্ব