দক্ষিণ পূর্ব

ফটিকছড়িতে অদৃশ্য জোটে বিএনপি,নতুন হিসেব-নিকেশে জামায়াত

sathi
sathi
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৫
পঠিত :
ফটিকছড়িতে অদৃশ্য জোটে বিএনপি,নতুন হিসেব-নিকেশে জামায়াত
মো. আজগর আলী, ফটিকছড়ি 

আগামী সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে বিএনপির বিরোধ মিটেছে এরই মধ্যে। ড. ইউনূস-তারেক বৈঠকের পর এখন অনেকটাই নিশ্চিত ফেব্রুয়ারি না হলেও আগামী এপ্রিলে নির্বাচন হচ্ছেই। আর ওই সমীকরণ মিলিয়ে লন্ডনের সেই বহুল আলোচিত বৈঠকের পর থেকেই সারা দেশে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। প্রিয় পাঠক দক্ষিণ-পূর্ব পত্রিকা ভোটারদের চাহিদা বিবেচনা করে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন দল থেকে কারা মনোনয়ন চান, কোন দল এগিয়ে কিংবা এসব এলাকার ভোটাররাইবা কী ভাবছেন এ সব বিশ্লেষণ নিয়ে আসনভিত্তিক ধারাবাহিক প্রতিবেদন তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছে। তারই অংশ হিসেবে এ পর্বে থাকছে চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি আসনের নির্বাচনী হালচাল। 

ফটিকছড়ির রাজনীতির মাঠে উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে আগামী ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। এই আসনটিতে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৬০৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৩৮ জন আর নারী ভোটার ২ লাখ ১৮ হাজার ৬৬৭ জন।

আসনটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে বিশেষ গুরুত্ববহন করলেও আওয়ামী শাসন আমলে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত জোটসঙ্গী বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনেএমপি নির্বাচিত হন। অবশ্য পরেরবার ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোন্দল ও তাদের জোটসঙ্গীদের নানা সমীকরনে ওই আসন হারান তরিকতের নজিবুল বশর। সেবার নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে আওয়ামীলীগের প্রয়াত সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ারের কন্যা খাদিজাতুল আনোয়ার সনি জয় লাভ করেন। এর আগে ২০০৮ সালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য ও চট্টগ্রামের প্রভাবশালী নেতা আলহাজ্ব সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এ আসন থেকে ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৩৩ ভোট পেয়ে জয় লাভ করেন।

৫ আগস্টে স্বৈরাচার হাসিনার পতনের পর ফটিকছড়ির দৃশ্যপটে নেই দলটি। গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটিকে নিয়ে এবার তাই রাজনৈতিক দলগুলোর হিসাব-নিকাশও নতুনভাবে মেলাতে হচ্ছে। তবে নতুন প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচনে এই আসনটিতে বিএনপির সাথে জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাষ দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিএনপিতে মনোনয়ন প্রত্যাশী অন্তত এক হালি নেতা 
 ফটিকছড়ি বিএনপির আহ্বায়ক কর্ণেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহার দীর্ঘদিন ধরেই এই আসনের রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি ২০১৮ সালে বিএনপির টিকিটে নির্বাচনও করেন। পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলীয় নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকাও রাখেন। অনেকের মতে দলীয় হাইকমান্ড এখনও তাকেই মূল প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। দক্ষিণপূর্বকে কর্ণেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহার মুঠোফোনে বলেন, দলের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত। দল মনোনয়ন দিলে ইনশাআল্লাহ ফটিকছড়িবাসীর দোয়া ও ভালোবাসা নিয়ে আমি নির্বাচিত হবো। অন্য কোনো দলের সাথে জোট গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর কথা ওটা কেন্দ্র ঠিক করবে। কেন্দ্র যে সিদ্ধান্ত দেবে ফটিকছড়ির জন্য আমি সেটাই মেনে নেব।

বিএনপির অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ন আহ্বায়ক বিশিষ্ট শিল্পপতি সারোয়ার আলমগীর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফটিকছড়ির বিভিন্ন এলাকার সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয়। সামাজিক কার্যকলাপেও তার অবদান কম নয়। দলের তৃণমূলের একাংশ তাকে প্রার্থী হিসেবে সমর্থন করছে। দক্ষিণপূর্বকে মুঠোফোনে তিনি বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচন করার ইচ্ছে আছে, তবে দল যাকে মনোনয়ন দিবে তার পক্ষেই কাজ করে যাব। 

বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেন বিএনপি কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে ফটিকছড়ির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। রাজনীতির বাইরে নৈতিক সাহস ও সততার মাধ্যমে গণমাধ্যমকে এগিয়ে নেওয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপির এই নেতা। দলের মনোনয়ন পেলে তিনিও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন ওই আসনে। এছাড়া প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ওঠে আসছে বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য সাবেক বিচারপতি ফয়সাল মাহমুদ ফয়জি, ডা. খোরশেদ জামিল চৌধুরী ও বেগম নুরী আরা সাফার নামও । 

একক প্রার্থী জামায়াতে

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ফটিকছড়ি আসন থেকে চূড়ান্তভাবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মো. নুরুল আমিন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফটিকছড়ির বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত। যুব সমাজের কাছে সৎ, উচ্চ শিক্ষিত ও দুর্নীতিমুক্ত নেতা হিসেবে অধ্যক্ষ মো. নুরুল আমিনের সুনাম রয়েছে। দক্ষিণপূর্বকে মুঠোফোনে অধ্যক্ষ মো. নুরুল আমিন বলেন, আমি এই ফটিকছড়ির সন্তান, ফটিকছড়ির মাটি ও মানুষের সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক। আমরা ফটিকছড়ি থেকে কখনও পালিয়ে যায়নি, হারিয়েও যায়নি। সুখে-দুঃখে সবসময় ফটিকছড়িবাসীর পাশে ছিলাম। এখনও আছি, ভবিষ্যতেও থাকব (ইনশাআল্লাহ)। ফটিকছড়ির অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জোটবদ্ধ নির্বাচন হবে কিনা- এ সিদ্ধান্ত মূলত কেন্দ্রই বিবেচনা করবে। তবে আমার সাথে ফটিকছড়ির সকল রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক ভালো। কারো সাথে কোন প্রকারের মতবিরোধ নেই। ফটিকছড়ির প্রতিটি ইসলামী দলকে আমি আমার দল মনে করি, প্রাণ থেকে ভালোবাসি। আশা করি আগামী নির্বাচনে ফটিকছড়ির সকল ইসলামী দলকে নিয়ে বৃহত্তর একটি ইসলামী মঞ্চ তৈরির মাধ্যমে ফটিকছড়ির সকল আলেম ওলামাদের দোয়া ও সহযোগিতায় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত ফটিকছড়ি উপহার দিতে পারবো। 

আলোচনায় নেই এনসিপি ও অন্যরা

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ফটিকছড়িতে নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছেন। তবে তাদের নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না স্থানীয়দের মাঝে। খেলাফত মজলিসের জোন পরিচালক মামুনুর রশীদ বলেন, খেলাফত মজলিস কেন্দ্রীয়ভাবে এখনও সারাদেশের কোথাও প্রার্থী ঘোষণা করেনি। কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল সারাদেশে দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করবে। তবে কেন্দ্র ঘোষিত এক আসনে ইসলামী দলের এক প্রার্থী-এক প্রতীক নীতি বাস্তবায়নের জন্য বৃহত্তর ইসলামী ঐক্যের স্বার্থে যে আসনে যে দল ভাল অবস্থানে থাকবে খেলাফত মজলিস সমঝোতার মাধ্যমে সেখানে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়ে মাঠে থাকবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সভাপতি সাইফুদ্দিন মাইজভান্ডারির সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফটিকছড়ি একাধিক সুন্নি মতাদর্শ ভিত্তিক কয়েকটি দলের নেতাদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেকটা অনিশ্চিত বলে জানান। গণঅধিকার পরিষদের ফটিকছড়ি উপজেলা সচিব গাজী আমান উল্লাহ তাদের দল ফটিকছড়িতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী দিবে বলে জানিয়েছেন।

ইসলামপন্থীদের সাথে জামায়াতের জোট; অদৃশ্য জোটে বিএনপি

মতাদর্শিক দূরত্বের কারণে জামায়াতের সঙ্গে ছোট ছোট দু-একটি ইসলামী দলের ঐক্য না হলে ফটিকছড়িতে ইসলামপন্থি বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সমঝোতা হতে পারে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এছাড়া এনসিপিরও থাকতে পারে জামায়াত জোটে। অন্যদিকে বাম ঘরানার ছোট ছোট দু-একটি  রাজনৈতিক দল ও সুন্নি মতাদর্শিরা এবার বিএনপির বাক্সে ভোট দিবে বলে অনেকে মনে করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সাবেক এক নেতা বলেন, এবার বিএনপির সাথে ফটিকছড়িতে ভোট কেন্দ্রীক অদৃশ্য ঐক্য তৈরি হতে পারে। হেফাজতে ইসলামের স্থানীয় এক নেতা দক্ষিণপূর্বকে বলেন, এবার বিএনপির জোটে ফটিকছড়ি গণপরিষদ, হেফাজতের একাংশ, সুন্নি মতাদর্শি ছোট ছোট দল গুলোসহ ফটিকছড়ির প্রায় ১৭টি চা-বাগানে কর্মরত চা-শ্রমিকের সংখ্যালঘু ভোট পরবে। এ নিয়ে পর্দার আড়ালে দলগুলোর নানা তৎপরতা চলছে।

জিততে হলে বেগ পেতে হবে জামায়াতকে:

ফটিকছড়ির রাজনৈতিক সচেতন অনেকে মনে করেন, জামায়াতে ইসলামী এককভাবে বা বিএনপির বাইরে কোনো জোট গঠন করলেও ভোটের মাঠে ফটিকছড়িতে জামায়াতে ইসলামী তেমন সুবিধা না-ও করতে পারে। জামায়াত অধ্যুষিত কয়েকটি ইউনিয়ন থাকলেও তাদের প্রার্থীদের জয়ী হতে বেশ বেগ পোহাতে হতে পারে। কারণ ঐসব ইউনিয়নে পুরুষ ভোটারের সমপরিমাণ মহিলা ভোটারও রয়েছে। স্থানীয়দের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে ঐসব ইউনিয়নে জামায়াতের ভোট বেশি থাকলেও সেখানে যদি বিএনপির ধানের শীষ বা কেউ বিএনপি থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়, তাহলে ভোট তিন ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে জামায়াতের প্রার্থী জয়ী হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। সাথে চা-বাগানের ভোট যদি বিএনপির বাক্সে পরে তাহলে বিএনপির জয় লাভের সম্ভাবনা বাড়বে। তবে ফটিকছড়ি আসনে নির্বাচনী লড়াই মূলত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বনাম জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও স্থানীয় রাজনৈতিক বিভাজন, ব্যক্তি জনপ্রিয়তা এবং তৃণমূল পর্যায়ের দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে সাংবাদিক নেতা কাদের গণি চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম মহানগরীর সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মো. নুরুল আমিন সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। 

নারী আর সংখ্যালঘু ভোটে পাল্টে যেতে পারে চিত্র: ফটিকছড়ির প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার ৬৬৭ জন নারী ভোটার এবং প্রায় ৫০ হাজার সংখ্যালঘু ভোটারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। যে দল বা যে নেতা মহিলা ভোট ও সংখ্যালঘু ভোট নিজেদেও পক্ষে নিতে পারবে তার জয়যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

ইই

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।