মোহাম্মদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম
আজগর আলী, ফটিকছড়ি
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে রিহান উদ্দিন মাহিন (১৪) নামের এক স্কুল ছাত্রকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মারার ঘটনা সারাদেশে আলোচিত হচ্ছে।এই ঘটনায় স্কুল পড়ুয়া তার দুই বন্ধুও মারাত্মকভাবে আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।এই কিশোরদের পিটিয়ে মারার কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে তিন কিশোরকে মধ্যযুগীয় কায়দায় প্রায় চার ঘন্টা ধরে পেটানোর পর পুলিশের উপস্থিতি নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।এরমধ্যে ঘটনায় জড়িতদের দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
নিহত রিহান উদ্দিন মাহিন উপজেলার কাঞ্চননগর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সাগর আলী তালুকদার বাড়ির মুদি দোকানি মোহাম্মদ লোকমানের একমাত্র সন্তান।ঘটনার সময় মাহিনের সাথে থাকা তার দুই বন্ধু ইসমাঈল হোসেন মানিক (১৫) ও ফারহান তানভীন রাহাতও (১৫) গণপিটুনির শিকার হয়। আহত মানিক স্থানীয় মাইজপাড়ার মোহাম্মদ ইসমাঈলের পুত্র ।আর রাহাত একই এলাকার মাতব্বর বাড়ির মোহামদ ইউসুফের পুত্র। তারা দু'জনই স্থানীয় শাহেন শাহ উচ্চবিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে মানিক বর্তমানে চমেক হাসপাতালের দুই নম্বর ওয়ার্ডে ও রাহাত ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছে।
কি ঘটেছিল সেই রাতে
সরেজমিনে জানা যায়,গত সপ্তাহে স্কুল শিক্ষার্থী মাহিন তার দুই বন্ধু রাহাত ও মানিককে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে যায়।সেখানে চারদিন বেড়ানোর পর বৃহষ্পতিবার (২১ আগস্ট) রাত একটার দিকে চট্টগ্রাম শহরে আসেন।এরপর অক্সিজেন মোড় থেকে একটা সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।রাত ৩ টার দিকে তারা বাড়ির পাশে সাগর আলী তালুকদার বাড়ির চেইঙ্গার ব্রিজ এলাকায় এসে গাড়ি থেকে নামেন।এসময় ভাড়া নিয়ে তাদের সাথে সিএনজি ড্রাইভারের বাদানুবাদ হয়।এরমধ্যে আগে থেকে থেকে সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা ৭-৮ জন ব্যক্তি তাদেরকে 'চোর চোর' বলে ধাওয়া করে।
প্রাণ বাঁচাতে তিন বন্ধু পার্শ্ববর্তী একটি নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেয়।আক্রমণকারীরা তাদের ধরে এনে চেইঙ্গার ব্রিজের রেলিংয়ের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাতভর নির্মমভাবে মারধর করে।মারধরে নেতৃত্ব দেন স্থানীয় মাষ্টার নাজিম,দোকানদার তৈয়ব,পল্লি চিকিৎসক নোমান,রড সিমেন্টের দোকানের ম্যানেজার মঈন উদ্দিন ও রায়হান।এছাড়াও ছিলেন স্থানীয় আযাদ, রফিক,ইলিয়াস,ইয়াসিন,শাহজান,আরমান,সুমন,বাবু ,মান্না,শুক্কর,ইমাম,তাজুল, তানভীর,আসিফ, শাওনসহ স্থানীয় কয়েকজন যুবক।তারা মাহিনদের সিএনজি ড্রাইভারকেও মারধর করেন।যদিও কিছুক্ষণ পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
জানা যায়, হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা সকাল প্রায় সাড়ে ৬ টা পর্যন্ত এই কিশোরদেরকে মারধর করেন।খবর পেয়ে মাহিনের বাবা মা ছুটে আসলেও থামেনি পিটুনি।একপর্যায়ে মাহিনের বাবা মুহাম্মদ লোকমানকেও মারধর করা হয়।এরমধ্যে সকাল সাড়ে ৬ টার দিকে ৯৯৯'র মাধ্যমে ফটিকছড়ি থানার পুলিশ এসে কিশোরদেরকে উদ্ধার করে।যদিও মাহিন ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
আহত স্কুল ছাত্র রাহাতের মা রুজিনা আক্তার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই প্রতিবেদককে বলেন, মাহিন, রাহাতসহ তিন বন্ধু কয়েক দিন আগে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলো।বেড়ানো শেষে তারা গত পরশু চট্টগ্রাম শহর হয়ে বাড়িতে ফিরছিলো।তারা শহরের অক্সিজেন মোড় থেকে ৭ শত টাকা ভাড়ায় একটি সিএনজি নেন।তবে তাদের পকেটে কোন টাকা ছিলো না।মাহিন বাড়ির সামনে এসে সিএনজিতে মানিককে রেখে রাহাতকে নিয়ে তাদের ঘর থেকে ভাড়ার টাকা আনতে যায়।তবে টাকা নিয়ে ফিরতে একটু দেরি হওয়ায় সিএনজি ড্রাইভারের সাথে তাদের কথা কাটাকাটি হচ্ছিলো।এরমধ্যে তৈয়ব সওদাগর( মাহিনের বাবার পাশের দোকানদার) এসে চোর চোর বলে চিৎকার করতে থাকেন।তার সাথে নাজিম মাস্টার,নোমান,মঈনসহ কয়েকজন যোগ দেন।তারা মাহিনদেরকে পাশের একটা ব্রিজে বেঁধে মারতে থাকেন।
নিহত মাহিনের মা খাদিজা আক্তার জানান, 'ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে তৈয়ব সওদাগরের সাথে তার (মাহিনের) বাবার আগে থেকে বিরোধ ছিলো।সেই বিরোধের কারণে মূলত চোর আখ্যা দিয়ে তাকে পিটিয়ে মেরেছে।আর দুইটা ছেলেকেও প্রায় মেরে ফেলেছে।এতটুকু বাচ্চা এমন কি অপরাধ করে ফেলেছে তাকে মেরে ফেলতে হবে।আর মাহিন যদি চুরি করেও থাকে তার তো বিচার করা যেতো।কেন আমাকে বুকটা খালি করে ফেললো তারা।'
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিশোর মাহিন এলাকায় ডানপিটে বলেই পরিচিত।তার নেতৃত্বে এলাকায় একটা কিশোর গ্যাংও আছে।ছেলেকে বখে যাওয়া থেকে ফেরাতে বাবা লোকমান নিজের মুদির দোকানে মাঝেমধ্যে বসাতেন।তবে মাহিন সুযোগ পেলেই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতো।এরমধ্যে তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু চুরির অভিযোগও আছে এলাকায়।
স্থানীয় মানিকপুর দাখিল মাদ্রাসার সুপার আনিসুর রহমান চৌধুরী বলেন,'নিহত মাহিন একসময় হিফজখানায় পড়তো।কয়েক পারা কুরআন শরীফ মুখস্তও করেছে সে। তার মাথায় একটু সমস্যা ছিল। তাই সে রাতে-বিরাতে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতো এবং বিক্ষিপ্ত কিছু চুরির সাথে জড়িয়ে পড়ে। আমাদের ছমুরহাট বাজারে একদিন রাতে সে একটি চায়ের দোকানে চুরির জন্য ঢুকে কলা-মুড়ি, অন্যান্য কিছু নাস্তা-পানি খেয়ে ঐ দোকানেই ঘুমিয়ে পড়ে। '
জানা যায়,সর্বশেষ গত সপ্তাহে মাহিন পাশের বাড়ির মৃত মুসার বাড়িতে ঢুকে টাকা চুরি করে।সেই টাকা নিয়ে মাহিন বন্ধু রাহাত ও মানিককে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে যায়।
মাহিনই ওই বাড়িতে চুরি করেছে বলে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।এরমধ্যে টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় মাহিন কক্সবাজার থেকে আবার বাড়িতে ফিরছিলো।আর ফিরেই সে হত্যাকান্ডের শিকার হয়।
মাহিনের বাবা মোহাম্মদ লোকমান বলেন, আমার ছেলে কক্সবাজার থেকে বাড়িতে ফিরেই কিছু লোকের আক্রোশের শিকার হয়েছে।সে নাকি মুছার বাড়িতে চুরির কথা স্বীকারও করেছে।আমি বলেছিলাম,এরকম হলে সে যা চুরি করেছে আমি জরিমানা দিবো।কিন্তু তারা আমার কথা শুনেননি।আমার মাসুম ছেলেকে আমার সামনেই মেরে ফেললো।আমাকেও তারা মারধর করেছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, রাতে মাহিনদেরকে মারধরের সময় থানা পুলিশকে বেশ কয়েকবার ফোন দেয়া হয়েছিলো।কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করেননি। এরমধ্যে ৯৯৯ এ ফোন পেয়ে সকাল সাড়ে ৬ টার দিকে ফটিকছড়ি থানা থেকে পুলিশ এসেছে।এরমধ্যেই মাহিন মারা যায়।
পুলিশের অবহেলার বিষয়ে জানতে চাইলে ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ( ওসি) নূর আহমদ বলেন,এই অভিযোগটি সত্য নয়।অনেক সাংবাদিক আমাকে এই বিষয়ে ফোন দিয়েছে। তবে এমন অভিযোগ কেউ করেননি। আমরা সেদিন খবর পাওয়া মাত্রই সেখানে গিয়ে ছেলেগুলোকে উদ্ধার করেছি।
তিনি বলেন, মাহিনকে হত্যার ঘটনায় ৫ জনের নাম উল্লেখপূর্বক একটি মামলা করা হয়েছে।এরমধ্যে নোমান ও আজাদ নামের দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়।বাকি আসামীদের গ্রেফতারে প্রচেষ্টা চলছে।