দক্ষিণ পূর্ব

বন্যা শেষে শুরু নতুন লড়াই, ঘরে ফিরেও স্বস্তি নেই দুর্গতদের

Riayad
Riayad
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬
পঠিত :
বন্যা শেষে শুরু নতুন লড়াই, ঘরে ফিরেও স্বস্তি নেই দুর্গতদের

ছবি দক্ষিণপূর্ব

টানা অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পর সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার পানি চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বন্যার রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ। কোথাও ধসে পড়েছে বসতঘর, কোথাও ভেঙে গেছে সড়ক। তলিয়ে নষ্ট হয়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, সবজিক্ষেত ও পানের বরজ। ভেসে গেছে মাছের ঘের ও চিংড়ি খামার, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য পোলট্রি খামার। চারদিকে এখন শুধু ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন আর সর্বস্ব হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাস।

 

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরসহ জেলার ১৬টি উপজেলায় বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ১২২টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায়। চলমান দুর্যোগে চট্টগ্রাম বিভাগে ৮ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিভাগজুড়ে এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলায় পাহাড়ধস ও বন্যায় ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১২ জন। বর্তমানে জেলার ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৬ হাজার ৮২১ জন মানুষ অবস্থান করছেন।

 

 

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে বাঁশখালী উপজেলায়। পানি কিছু এলাকায় কমলেও এখনো বহু গ্রাম পানির নিচে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচল সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে।

 

সরেজমিনে বাহারছড়া, গণ্ডামারা, ছনুয়া ও পুইছড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। প্রধান সড়কের বিভিন্ন স্থানে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক ভেঙে গেছে কিংবা পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। অনেক পরিবার ঘরে ফিরলেও বসবাসের মতো পরিবেশ নেই।

 

ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাঈফ আনোয়ার বলেন, "পানি কমলেও বাড়িতে ফিরে অনেকেই বসবাসের মতো পরিবেশ পাচ্ছেন না। কারও ঘর সম্পূর্ণ ধসে গেছে, কেউ সব হারিয়ে অসহায়ের মতো দিন কাটাচ্ছেন। অনেক দুর্গত পরিবার এখনও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পায়নি।"

 

গণ্ডামারা ইউনিয়নের বাসিন্দা শফকত হোসাইন চাটগামী জানান, গণ্ডামারা, ছনুয়াসহ কয়েকটি ইউনিয়নে এখনও পানি রয়েছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে না পেরে পানিবন্দি অবস্থাতেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

 

বাহারছড়া ইউনিয়নের সৌদি প্রবাসী আব্দুল্লাহ বলেন, "বন্যার আট দিন পার হলেও অনেক মানুষের চুলায় আগুন জ্বলেনি। যেসব স্লুইস গেট মাছ চাষের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল, সেগুলোর কারণেও পানি দ্রুত নামতে পারেনি।"

 

পুইছড়ি এলাকার বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, "সকালের বৃষ্টির পর পানি আবার বেড়েছে। বাড়ির চারপাশের রাস্তা ও নিচু জমি এখনও পানির নিচে। আমরা কার্যত ঘরবন্দি।"

 

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, উপজেলায় এখনো প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে চার হাজারের বেশি কাঁচা ও মাটির ঘর ধসে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তালিকা প্রস্তুতে প্রশাসনের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।

 

 

সোমবার থেকে সাতকানিয়ায় বন্যার পানি নামতে শুরু করায় আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন দুর্গত মানুষ। কিন্তু বাড়িতে ফিরেও মিলছে না স্বস্তি। অধিকাংশ ঘর কাদা ও আবর্জনায় ভরে গেছে। পানিতে নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী। অনেকের মাটির ঘর ধসে পড়ায় মাথা গোঁজার ঠাঁইও নেই। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

 

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ ছিলেন। সোমবার পানি কমতে শুরু করলে তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন।

 

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি ইউনিয়ন থেকে পানি নেমে গেলেও কিছু এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

 

 

পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি ও মৎস্য খাতের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও সামনে এসেছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির নিচে নষ্ট হয়েছে ধান, সবজি, পানের বরজসহ বিভিন্ন ফসল।

 

এ ছাড়া প্রায় ১০ হাজার বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, শুধু মৎস্য খাতেই প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কৃষক ও মৎস্যচাষিরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন মুহূর্তেই পানিতে ভেসে গেছে।

 

 

বন্যার পানি নামলেও নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় নলকূপ এখনও ব্যবহার উপযোগী নয়। বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, জ্বরসহ বিভিন্ন জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। পাশাপাশি সাপের উপদ্রবও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

 

 

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, সোমবার পর্যন্ত দুর্গত মানুষের মধ্যে ৬৮৪ টন চাল এবং ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আগামী কয়েকদিনও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

 

 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৪২ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যদিও পানি ধীরে ধীরে কমছে, তবে সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুনর্বাসন। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, কৃষি ও মৎস্য খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া, বিধ্বস্ত সড়ক মেরামত, কর্মহীন মানুষের জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরএইচ/ দক্ষিণপূর্ব 

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।