দক্ষিণ পূর্ব

বাংলাদেশে বেকারত্ব কীভাবে অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে: একটি অপরাধতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

Masud forhan
Masud forhan
প্রকাশ : ৩ আগস্ট ২০২৬
পঠিত :
বাংলাদেশে বেকারত্ব কীভাবে অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে: একটি অপরাধতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

প্রতীকী ছবি

দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদী কর্মহীনতায় ভুগছে আর এই সংকট ক্রমেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ছায়া ফেলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধীরে ধীরে বেড়ে প্রায় সাড়ে চার শতাংশে পৌঁছেছে। তবে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি - ৯ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে  আর শিক্ষিত স্নাতকদের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।


পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯-২০২৬  সময়কালে মাদক-সংক্রান্ত মামলা মোট অপরাধের প্রায় ৪০ শতাংশ, এরপরই রয়েছে নারী-শিশু নির্যাতন ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত অপরাধ। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ক্রমবর্ধমান কর্মহীনতা এই প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করছে, যদিও এটি একমাত্র কারণ নয়।


কারণ যেখানে শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য, শিল্প খাতে ধীরগতির কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুর্বল সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী - এই তিন কারণকে প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করছেন অর্থনীতিবিদরা। দীর্ঘমেয়াদী কর্মহীনতা আর্থিক হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে, যা কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ আয়ের পথে ঠেলে দেয়।

 

অপরাধের চিত্র: সম্পত্তি-সংক্রান্ত অপরাধ ,চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ক্রমবর্ধমান সাইবার প্রতারণা - এই ধরনের অপরাধে বেকার তরুণদের সম্পৃক্ততা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। শহরাঞ্চলে ছিনতাই ও সাইবার অপরাধ, গ্রামাঞ্চলে সম্পত্তি-সংক্রান্ত সহিংসতা তুলনামূলক বেশি।


ভুক্তভোগীর কষ্ট: আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভুক্তভোগীরা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক আঘাতের শিকার হচ্ছেন। বিশেষত নারী ও শিশুরা যারা প্রায়ই সহিংসতা ও পাচারের শিকার হন , তাদের ক্ষেত্রে পরিণতি আরও গুরুতর। অপরাধভীতি জনসাধারণের, বিশেষত নারীদের, স্বাভাবিক চলাফেরাও সীমিত করে দিচ্ছে।


আইনি কাঠামো: দণ্ডবিধি ১৮৬০, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০—এই আইনগুলো তাত্ত্বিকভাবে ব্যাপক সুরক্ষা দিলেও মামলা জট ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাস্তবায়নে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।


পুলিশের ভূমিকা: কমিউনিটি পুলিশিং ও সাইবার ইউনিট সম্প্রসারণের মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও জনবল ঘাটতি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও প্রতিক্রিয়াশীল পদ্ধতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


তত্ত্ব যা বলে: অপরাধতত্ত্ববিদদের মতে, বেকারত্ব ও অপরাধের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে বিভিন্ন অপরাধতাত্ত্বিক তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রবার্ট কে. মার্টনের স্ট্রেইন থিওরি (Strain Theory) অনুযায়ী, সমাজে সফলতা ও আর্থিক সমৃদ্ধিকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও সবার জন্য সেই লক্ষ্য অর্জনের বৈধ সুযোগ সমান থাকে না। দীর্ঘদিন বেকার থাকা ব্যক্তি যখন বৈধ উপায়ে জীবনের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হন, তখন কিছু মানুষ বিকল্প বা অবৈধ পথ—যেমন চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা বা প্রতারণার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন।


অন্যদিকে, এডউইন সাদারল্যান্ডের ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন থিওরি (Differential Association Theory) বলছে, অপরাধমূলক আচরণ জন্মগত নয়; এটি সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শেখা হয়। দীর্ঘদিন কর্মহীন তরুণরা যদি অপরাধপ্রবণ বন্ধু বা গোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসেন, তাহলে তাদের মধ্যেও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।


এছাড়া ক্লোয়ার্ড ও ওহলিনের অপরচুনিটি থিওরি (Opportunity Theory) অনুযায়ী, বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকলে এবং অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জারের সুযোগ সহজলভ্য হলে কিছু ব্যক্তি অপরাধকে বিকল্প পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেকারত্বকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি সামাজিক বৈষম্য, হতাশা এবং অপরাধপ্রবণতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগকে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।


করণীয়: বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করছেন—কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বৃদ্ধি এবং পুলিশের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো। তাদের মতে, একক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বদলে প্রতিরোধমূলক ও পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগের সমন্বয়ই টেকসই সমাধান দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিশ্বব্যাংক, ILO, বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)।


লেখক: মারজিয়া জাবিন 
প্রথম বর্ষ, ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।