নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানার ওসির সাথে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর ফোনালাপের অডিও ফাঁস হয়েছিলো কিছুদিন আগে।সে অডিওতে বায়েজিদের ওসি আরিফুর রহমানকে আরেক থানার ওসির বিষয়ে বিষোদগার করতে শুনা যায়। তাঁর( আরিফুর) বিরুদ্ধে ছাত্রদল নেতাকে দল থেকে বহিস্কার করানোর দায়িত্ব নেওয়ার কল রেকর্ডও ভাইরাল হয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সভায়ও বক্তব্য রেখে ভোট চেয়েছেন তিনি প্রকাশ্যে। এছাড়া ছাত্রলীগ নেতার দায়ের করা মামলায় এই ওসি এক ছাত্রদল নেতাকে গ্রেপ্তার করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শুধু তাই নয়, এক সন্ত্রাসীর স্ত্রীকে পিটিয়ে ভ্রুণ হত্যার অভিযোগে মামলাও হয় ওসি আরিফুরের বিরুদ্ধে। পরে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে দেওয়া তার বক্তব্যও ভাইরাল হয়। এমন সব ঘটনার পর তার পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও স্বপদে বহাল আছেন তিনি।
সম্প্রতি ওসি আরিফুর রহমানের ভাইরাল হওয়া এক অডিও রেকর্ডে তাকে বলতে শোনা যায়, সম্প্রতি তিনি কোনো এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছেন। এর আগে ওই ব্যক্তির ভাইকে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করিয়েছেন। বহিষ্কৃত এই ছাত্রদল নেতার নাম সাইফুল ইসলাম সাইফ।তিনি আওয়ামী লীগের সময়ে পুলিশের গুলিতে পা হারিয়েছিলেন।
আরেকটি অডিওতে ওসি আরিফুর রহমানকে পাঁচলাইশের ওসি মুহাম্মদ সোলাইমানের বিরুদ্ধে এক সন্ত্রাসীর কাছে চরম বিষোদগার করতে দেখা যায়। সেখানে তিনি বলছেন, পাঁচলাইশের ওসি মুহাম্মদ সোলাইমান সবকিছু করতেছেন। তিনি আমার বিরুদ্ধে কমিশনার স্যারকে প্যাঁচ লাগিয়েছেন।
জানা যায়, বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি হিসেবে গেল বছরের ৫ আগস্ট পরবর্তী যোগ দেন পুলিশ পরিদর্শক আরিফুর রহমান। গেল বছরের ৫ ডিসেম্বর পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদকে ধরতে গিয়ে তিনি ব্যর্থ হন। উল্টো সাজ্জাদ পুলিশকে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। তবে সাজ্জাদকে না পেয়ে তার স্ত্রী তামান্না শারমিনকে ধরে নিয়ে আসেন ওসি আরিফুর রহমান।
কিছুদিন পর জেল থেকে বের হয়ে ওসি আরিফুর রহমানসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন তামান্না শারমিন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, পুলিশি হেফাজতে সীমাহীন নির্যাতন করা হয় তামান্নাকে। আর সেই নির্যাতনে আর গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে। ভ্রুণ হত্যার অভিযোগে করা সেই মামলায় তামান্না শারমিন বলেন, আমাকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে মামলা দিয়ে চালান করে ওসি আরিফ। কিন্তুু আমার কি অপরাধ। আমার গর্ভের অনাগত সন্তানের কি দোষ?
তিনি সম্প্রতি অভিযোগ করেন, কোনো অপরাধে জড়িত না থাকলেও ওসি আরিফুর রহমান তাকে একে একে তিনটি মামলায় আসামি করেছেন। এর মধ্যে একটি মামলা হয়েছে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ায় অভিযোগে বায়েজিদ বোস্তামী থানায়। একটি পাঁচলাইশ থানায় ১ কোটি টাকা চাঁদাদাবির অভিযোগে। অন্যটি বাকলিয়ার ডাবল মার্ডার মামলা। তিনি বলেন, আমি নারী মানুষ। একজনকে বিয়ে করেছি। তা কি আমার অপরাধ। যে সময় আমার স্বামী গ্রেপ্তার হয়ে পুলিশ হেফাজতে আছে সেখানে কিভাবে সে ডাবল মার্ডার করল?
এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরিফুর রহমানের একটি বক্তব্য ভাইরাল হয়ে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে উচ্চকণ্ঠে দেওয়া সেই বক্তব্যে তাকে বলতে শোনা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি না হলে কখনও বাংলাদেশ হতো না। তাকে সর্বদা স্মরণ করা উচিত। সেই বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ৪১ সালের ভিশন বাস্তবায়ন করতে হবে। তাকে ৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখলে বাংলাদেশ বদলে যাবে। কুমিল্লার দেবিদ্বার থানায় দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে দেওয়া ওই বক্তব্যে তিনি সেখানকার আওয়ামী লীগের তৎকালীন বিতর্কিত সংসদ সদস্যকে এগিয়ে নিতে সবাইকে তার পেছনে কাজ করার পরামর্শ দেন।
সম্প্রতি পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। কিন্তু রিমান্ডে এনে তাকে নিয়ে রাউজানের কদলপুর এলাকায় নেওয়ার পর শোডাউন করে বায়েজিদের ওসি আরিফুর রহমান। প্রকাশ্যে তাকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘুরিয়ে মাইকিং করতে দেখা যায় এ কর্মকর্তাকে।
এ ঘটনার পর নানা প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের ভূমিলা নিয়ে। স্থানীয়রা বলছেন, দফায় দফায় ছোট সাজ্জাদকে রিমান্ডে নিয়ে একটি অস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। কিন্তু সাজ্জাদকে সাথে নিয়ে মাইকিং করে শোডাউন করে ক্রেডিট নিতে ব্যস্ত ছিলেন ওসি আরিফুর রহমান।
এদিকে বায়েজিদ থানার ওসি আরিফুর রহমান, এসআই মেজবাহ, এএসআই সৈয়দ আবুল হাশেমের বিরুদ্ধে ছাত্রদল নেতা মেজবাহ উদ্দিন গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানোর অভিযোগ ওঠেছে। অথচ যে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ওই মামলার আসামীই ছিলেন না মেজবাহ উদ্দিন। গত ২৩ এপ্রিল এ ঘটনায় সিএমপি কমিশনার বরাবর অভিযোগ দেয় ভুক্তভোগী। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ভুক্তভোগী মেজবাহ উদ্দিন পাঁচলাইশ থানা যুবদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য। ৫ আগস্ট এর আগেও স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের আমলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিরপরাধ ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে মামলা দিয়ে হয়রানি করে আসছিলেন। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা মঈনুদ্দিন আহমেদ মুবিনের দায়ের করা মামলায় মেজবাহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে গত ২০ এপ্রিল আদালতে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তারের সময় মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মেজবাহ উদ্দিন ও গ্রেপ্তার হওয়া মেজবাহ উদ্দিন এক নয় দাবি করলেও ওসি আরিফসহ আরও দুই পুলিশ কর্মকর্তা তা আমলে নেননি। পুলিশের এই কর্মকর্তারা টাকা দাবি করেছিলেন ছাত্রদল নেতা মেজবাহ উদ্দিনের কাছে। একপর্যায়ে ওসি আরিফুর রহমানকে 'স্যার' না বলায় তাকে কিল ঘুষি মেরে আহতও করেন ওসি আরিফ। টাকা না দেওয়ায় আসামী না হওয়া সত্ত্বেও মেজবাহ উদ্দিনকে এই মামলায় চালান করে দেয় পুলিশ।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী পুলিশ কর্মকর্তা ওসি আরিফুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বাছাই করে করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হয়রানি করে আসছে। মূলত এখনো তিনি স্বপদে বহাল থেকে পুলিশের কিছু কর্মকর্তার আশ্রয় প্রশ্রয়ে আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত।
এসব বিষয়ে জানতে কল করা হলে বায়েজিদ থানার ওসি আরিফুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা যখন সন্ত্রাসীদের ধরতে যাই, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করি তখনই তারা নানা কিছু বের করে সেগুলো ভাইরাল করে। একথা বলেই আরিফুর রহমান ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উত্তর বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যার মন্তব্য দেখেছেন তাকে (ওসি) প্রশ্ন করুন।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা রাজনৈতিক নেতার মতো বক্তব্য দিতে পারেন কিনা, দল থেকে কাউকে বহিস্কার করানো তার কাজ কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এটা আপনিই ভাল জানেন। এ সময় আরিফুলের ফাঁস হওয়া কল রেকর্ডে অপর প্রান্তের অফিসারের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি তাও জানেন না বলে দাবি করেন।