দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ২০১৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণের পর দীর্ঘদিন স্থবির থাকা প্রকল্পটি আবারও গতি পেয়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) আনোয়ারার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে নির্মাণাধীন সিইআইজেডের উন্নয়নকাজের উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা যায়, আনোয়ারার ৭৭৬ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ব্যয় করবে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ বিনিয়োগ করবেন চীনা বিনিয়োগকারীরা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হবে। তবে আগামী ১৮ মাসের মধ্যেই প্রথম কারখানায় উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্প চালু হলে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগই দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বিনিয়োগের মাধ্যমেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং বাংলাদেশ এখন সার্বক্ষণিক ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত। সিইআইজেডের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও অবকাঠামোসহ সামগ্রিক বিনিয়োগ এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে সরকার দ্রুত সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিস চালু করছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে তাদের মুনাফা ও মূলধন নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে পারেন, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজার পুনর্গঠন করা হয়েছে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্থানীয়ভাবে মূলধন সংগ্রহ করতে পারেন।
চীনা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং কৌশলগত খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে চট্টগ্রামে একটি স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠায় চীনের সহযোগিতা কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে কয়েকজন চীনা বিনিয়োগকারীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সাব-লিজ দেওয়া জমির দলিলও হস্তান্তর করা হয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সিইআইজেডে বিনিয়োগকারীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকল্পের নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন করিডোর এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত থাকবে।
তিনি বলেন, বেজার ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে দ্রুত অনুমোদন, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সংযোগ নিশ্চিত করে একটি সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হবে।
সিইআইজেডের ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটি কর্ণফুলী টানেল থেকে মাত্র ৭০০ মিটার, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এন-১ জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকায় এখানকার পণ্য পরিবহন দ্রুত ও সহজ হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, আনোয়ারা-কর্ণফুলীর সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, সিইআইজেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনকিয়াং, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান লি চেংগুই এবং চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মোহাম্মদ এনামুল হক, শাহজাহান চৌধুরী, মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসনের সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, চীনা বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আরএইচ