দক্ষিণ পূর্ব

রহস্যাবৃত শাহজাহান চৌধুরী,শহর ছেড়ে গ্রামে প্রত্যাবর্তন

RAFIQ HYDER
RAFIQ HYDER
প্রকাশ : ৮ জুলাই ২০২৫
পঠিত :
রহস্যাবৃত শাহজাহান চৌধুরী,শহর ছেড়ে গ্রামে প্রত্যাবর্তন
মাসুদ আলম 
জামায়াতের চট্টগ্রাম মহানগর আমীরের পদ থেকে শাহজাহান চৌধুরীকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তিনি সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে দলটির প্রার্থী। চট্টগ্রাম নগরজুড়ে জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে সংঘটিত করার কাজটি সুচারুরূপেই করে যাচ্ছিলেন তিনি। তার অভিজ্ঞতা ও কৌশলের কাছে অনেকটাই ধরাশায়ী অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিশালী পক্ষগুলো। এককথায়, জামায়াত ও শিবিরের রাজনৈতিক ঢাল হয়েই ছিলেন তিনি। হঠাৎ নগর রাজনীতি ছেড়ে 'মাটির কাছে' তার প্রত্যাবর্তনের ফলে শহুরে রাজনীতিতে জামায়াত রাজনৈতিক শূন্যতা দেখা যেতে পারে বলে মনে করছে রাজনীতি সচেতন অনেকেই। আবার ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন জামায়াতের পদ নিয়ে নেতাদের অতো 'মাথা ব্যথা' থাকে না বলেও দাবি করেছেন অনেকে।

গোটা চট্টগ্রাম নগরীর দলের আমীরের মতো প্রভাবশালী পদ ছাড়ার বিষয়ে নানা গুঞ্জন থাকলেও দলটির নেতাকর্মী ও রাজনীতি সচেতন মানুষের কথা, জনতার শাহজাহান চৌধুরীর 'নিজ মাটির' কাছেই ফিরে যাওয়াই যেন অন্তিম কাঙ্খিত। কারণ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মধ্যে বাস্তব 'জননেতা' হওয়ার সৌভাগ্য চট্টগ্রামে আর কোনো নেতার হয়নি। ব্যক্তি শাহজাহান চৌধুরীর প্রভাব শুধু নগর জামায়াতের কর্মী, সদস্যদের মধ্যেই নয়, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপরও রয়েছে। 

কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা শামসুল ইসলামের সঙ্গে শাহজাহান চৌধুরীর বিরোধ মোটামুটি রাজনীতি পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত। 'সত্য-মিথ্যা' যাই হোক, এ নিয়ে কখনো মুখ খুলেনি জামায়াতের কেউই। কিন্তু লোকমুখে আলোচনা আছে, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে দলটির প্রার্থীতা নিয়েই এ বিরোধ এক দশকেরও আগে থেকে শুরু হয়। কিন্তু দলের ভেতরে-বাইরে জনপ্রিয়তার 'চাপের' কাছে শাহজাহান চৌধুরীর প্রভাব পদের ঊর্ধ্বে। নানা চাপের মুখেও জামায়াতের আনুগত্য ছাড়েননি তিনি। কিন্তু সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে শাহজাহান চৌধুরী অনেক সময় আপোষ করেছেন। জামায়াতের সাংগঠনিক চর্চা ও প্রথা ভেঙে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চেইন অব কমান্ড রক্ষা হয়নি এতে।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহম্মদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা, আহলে সুন্নাত জামাতের অনুসারী ও মাজারভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি 'বেফাঁস' মন্তব্য চট্টগ্রামে বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তবে এর কারণ হিসেবে শাহজাহান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠরা বলছেন, তরিক্বত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর দায়ের করা মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের। পরে তাদের ফাঁসি দেওয়া হয় যুদ্ধাপরাধের দায় চাপিয়ে। এ কারণেই সুন্নীভিত্তিক ও মাজারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন শাহজাহান চৌধুরী। যদিও পরবর্তীতে ফেসবুকে ভিডিও বার্তা দিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। 

জামায়াতের একাধিক নেতা জানান, মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীরের পদে থাকাকালীন বিভিন্ন ক্ষেত্রে তদবির করতেন তিনি। চট্টগ্রামজুড়ে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নেতাকর্মী ও জামায়াতের শুভাকাঙ্ক্ষীদের চাকরি, ব্যবসার তদবিরের জন্য শাহজাহান চৌধুরীর দুয়ার ছিল খোলা। চট্টগ্রামে দেয়ানবাজার এলাকার জামায়াত অফিসে সন্ধ্যা নামলে এই তদবিরের হাট বসতো রীতিমতো। এমনকি দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও  সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার বিএনপি হেফাজতে ইসলামসহ নানা রাজনৈতিক দলের সমর্থক, কর্মীদের জন্যও তদবির করার অভিযোগ রয়েছে শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে।

সাতকানিয়া-লোহাগাড়া একাধিক রাজনীতি সচেতন ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা গেছে, একসময় শাহজাহান চৌধুরীর নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী ছিল। আওয়ামী লীগের সাথে 'ফাইট' করে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় টিকে থাকতে জামায়াতের কর্মী, সদস্যদের নিরাপদ রাখতে এই  বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ১৯৯১ সাল থেকে ওই ক্যাডার বাহিনীকে সাতকানিয়ায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবহার শুরু করেন।যদিও এই নিজের কোন বাহিনী থাকার কথা অস্বীকার করতেন শাহজাহান চৌধুরী। 

সম্প্রতি নগরীর জামাল খান সড়কে বাম ছাত্র সংগঠনের জামায়াত বিরোধী মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে জামায়াত কর্মী আকাশের এক নারী কর্মীকে লাথি মারার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই জামায়াত কর্মী শাহজাহান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

জামায়াত সংশ্লিষ্ট নন এমন কেউ কেউ বলছেন, চট্টগ্রামের রাজনীতিবিদদের মধ্যে শাহজাহান চৌধুরী 'চরিত্র'টি রহস্যাবৃত। যাকে ভয় পেতো আওয়ামী লীগ। তাই সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনকালে কারাগারেই আটক থাকতে হয়েছে তাকে প্রায় ১০ বছর। রাজনীতির মাঠে প্রভাবশালী এই নেতার অবস্থান তার দল জামায়াত ইসলামীতে কেমন, তা নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই। শাহজাহান চৌধুরীর কাছে সকলেই যেতে পারেন, এটাই হচ্ছে জামায়াতের বড় প্রাপ্তি। কারণ জামায়াতে এমন জননন্দিত নেতা চট্টগ্রামে একজনও নেই।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমীর পদ থেকে হঠাৎ তাকে সরিয়ে দেওয়ার পর শাহজাহান চৌধুরীকে নিয়ে আলোচনার পালে হাওয়া লেগেছে অনেকটা জোরেশোরেই। একদিকে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ঘোষণা, অন্যদিকে মহানগর আমীরের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদ থেকে 'মাঝপথে' সরিয়ে দেওয়াকে জামায়াত সংশ্লিষ্টরা ব্যাখ্যা দিচ্ছে একেকজন একেকভাবে। 

জামায়াতের সাংগঠনিক নেতাদের বক্তব্য, চট্টগ্রামজুড়ে বিভিন্ন আসনের নির্বাচনী মাঠে নিখুঁত 'খেলা' দেখাতেই শাহজাহান চৌধুরীকে সাংগঠনিক চাপ মুক্ত রাখা হচ্ছে। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া ছাড়াও জামায়াতের এই 'কিং মেকার'কে 'মাথা ঘামাতে' হচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের কয়েকটি আসনে। যেগুলোকে জামায়াত নিজেদের করে নিতে চায়। চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে ইসলামীর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাহমুদ উল্লাহ বলেন, তাকে বড় কোন দায়িত্ব দেওয়ার জন্যই মহানগর আমিরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

শাহজাহান চৌধুরীর 'ভক্ত' যারা জামায়াতকে সমর্থন করেন তাদের বক্তব্য, আমীরের পদে থেকেও জামায়াতের অনেক শীর্ষ নেতা সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তার বেলায় কেন এমন হলো-এই প্রশ্নও রেখেছেন তারা।

শাহজাহান চৌধুরী রাজনীতির মাঠে পাকাপোক্ত নেতা। অনলবর্ষী বক্তা। কথার ফুলঝুরি উপচে পড়ে মঞ্চে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যুক্তি ও তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনে তার কথায় কখনো উত্তাল, তরঙ্গময় হয়ে ওঠে মঞ্চের সামনের হাজারো জনতা। কখনো পিনপতন নীরবতা ঢেলে জনতাকে করে তোলেন মোহিত। কখনো তার মুখে ফুটে উঠে বাঙালির হাতে বৃটিশ তাড়ানোর গল্প। কখনো বা শোনা যায় নবী, রাসুল বা রাসুলের সাহাবীদের ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাস। এককথায় রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়ালে শাহজাহান চৌধুরী রাজনীতিবিদ, আবার মাহফিলের মঞ্চে তিনি পুরোদস্তুর আলেম।

পাকিস্তান আমলে ইসলামী ছাত্র সংঘের হাত ধরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি শাহজাহান চৌধুরীর। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বনেদি পরিবারে জন্ম তাঁর। ছাত্ররাজনীতির পালা শেষে তিনি যোগদান করেন জামায়াত ইসলামীতে। সেখান থেকেই ঘটে তার রাজনৈতিক উত্থান। দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসন থেকে। 

স্থানীয় রাজনীতি সচেতন মানুষের মধ্যে সবসময় যে ক'কজন রাজনীতিবিদ আলোচনায় থাকতেন, তাদের মধ্যে অন্যতম শাহজাহান চৌধুরী। চট্টগ্রামের রাজনীতিকদের মধ্যে পপুলার তিন 'চৌধুরী'। তাদের মধ্যে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পাশাপাশি শাহজাহান চৌধুরীর নাম জড়িত ওতোপ্রোতভাবে। তিন রাজনীতিক তিন মেরুতে রাজনীতি করলেও, তাদের মধ্যে ছিল সখ্যতাও। চট্টগ্রামে স্বার্থ রক্ষায় তাদের অবস্থান ছিল চট্টগ্রামেরই পক্ষে। অনেকেই বলতেন, রাজনৈতিক আদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে এই তিন জনের মধ্যে ছিল সমন্বয়। এ জন্য দলীয় ফোরামে এই তিন জনের নামে ছিল নানান সমালোচনা। বর্তমানে তিন চৌধুরীর মধ্যে শাহজাহান চৌধুরীই বেঁচে আছেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধাপরাধে যুক্ত থাকার তকমা দিয়ে বিএনপি'র প্রভাবশালী নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসি দেয় পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আদালত। নগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর। জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী এখন মাঠে সক্রিয়। চট্টগ্রামের রাজনীতির মাঠে 'খেইল' দেখাচ্ছেন এই 'চৌধুরী'। 

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল বিদেশীদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদের চট্টগ্রাম থেকে প্রথম প্রতিবাদ করেছেন শাহজাহান চৌধুরী। ভরাট হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া বির্জাখাল তার নেতৃত্বে খনন করে জামায়াতের নেতাকর্মীরা। রাজনীতির মাঠে এ ঘটনা বেশ আলোচিত। এছাড়া চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করে জামায়াতকে প্রভাবশালী করে রাখতেও শাহজাহান চৌধুরীর ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন মামলা দিয়ে তাকে কারাগারে আটকে রেখেছে প্রায় এক দশক। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমন ঘিরে ঢাকার বায়তুল মোকাররমে মুসল্লিদের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে হাটহাজারীতেও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। এই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ওই বছর ১৪ মে সাতকানিয়া পৌরসভা এলাকার ছমদরপাড়ার বাড়ি থেকে ঈদুল ফিতরের রাতে শাহজাহান চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি মুক্তি পান কারাগার থেকে। এরপর থেকে চট্টগ্রাম জামায়াতের আমীরের দায়িত্ব নিয়ে সংগঠিত করেন জামায়াতকে। 

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, আমি জামায়াত ইসলামী করি আল্লাহ'র সন্তুষ্টির জন্য। জামায়াত ইসলামই আমাকে জনগণের খেদমত করার দায়িত্ব দিয়েছে। সংগঠন যখন যেভাবে দায়িত্ব দিয়েছে, আমি সে দায়িত্বই পালন করেছি। সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার মানুষের জন্য আমি আমার সবটুকু উজাড় করে অতীতেও কাজ করেছি, সামনেও এই জনপদের ভাগ্য উন্নয়নে আমি কাজ করে যাবো।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।