আলমগীর মানিক, রাঙামাটি
রাঙামাটির কাপ্তাই আপস্ট্রিম জেটিঘাটের ইজারা দরপত্রকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দরপত্র জমা দিতে বাধা, টেন্ডার শিডিউল ছিঁড়ে ফেলা এবং প্রতিনিধিকে আটকে রাখার অভিযোগে লিখিত আবেদন করেছেন ফয়সাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল কাইসার চৌধুরী। যদিও অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) সিবিএ (রেজি. নং-১৮৮৬)-এর সভাপতি মো. বেলাল।
এ ঘটনায় কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আব্দুল্লাহ আল কাইসার চৌধুরী জানান, গত ২১ জুন ২০২৬ কাপ্তাই আপস্ট্রিম জেটিঘাটের ইজারা সংক্রান্ত দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট এবং দরপত্র খোলার সময় ছিল দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট। ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে তিনি তাঁর প্রতিনিধি মো. মোজাফফর হোসেনকে দরপত্র জমা দেওয়ার দায়িত্ব দেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিনিধি সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে ডেপুটি ম্যানেজারের কার্যালয়ে পৌঁছালে মো. বেলাল ও তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি দরপত্র জমা দিতে বাধা দেন। পরে প্রতিনিধিকে একটি কক্ষে আটকে রেখে টেন্ডার শিডিউল ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং সঙ্গে থাকা পে-অর্ডার ফেরত দেওয়া হয়। অভিযোগকারীর দাবি, পুরো ঘটনাটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে এবং ফুটেজ পর্যালোচনা করলে ঘটনার সত্যতা মিলবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি উপ-ব্যবস্থাপক (যান্ত্রিক সার্ভিস) প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানকে জানালে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়নি। এরপর কাপ্তাইয়ের রণজয়ী ৩৮ জোন সেনাবাহিনীকে অবহিত করলে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. বেলাল বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, "তদন্তে যদি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে কর্তৃপক্ষ যে শাস্তি দেবে তা মেনে নেব। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে মানহানির জন্য আইনের আশ্রয় নেব।"
তিনি আরও দাবি করেন, অভিযোগকারী ও তিনি একই এলাকার বাসিন্দা হলেও তাঁদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। তিনি একজন সরকারি চাকরিজীবী এবং সিবিএ নেতা হিসেবে টেন্ডারবাজির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও উল্লেখ করেন।
ঘটনার পর কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটির সদস্য ও কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক সংরক্ষণ বিভাগ-১) মোহাম্মদ কায়ছুল বারী জানান, তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজসহ সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হয়েছে এবং দুই দিন আগে প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, গত অর্থবছরে জেটিঘাটটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হলেও এবার একটি পক্ষের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গতবারের ইজারাদাররা এবার ৩২ লাখ ৮৫ হাজার টাকার দরপত্র জমা দিতে চাইলেও তা জমা দিতে না দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয়। এতে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি ইজারার ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতি বছর মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা থাকলেও এবার আগের বছরের তুলনায় কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সরকারের রাজস্ব ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে একই জেটিঘাটের ইজারামূল্য ছিল প্রায় ১৭ লাখ টাকা। পরে তা বেড়ে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু এবার রহস্যজনকভাবে কম দামে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার পর এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।