দক্ষিণ পূর্ব

রাঙ্গুনিয়া বিএনপিতে বিভক্তি, সুযোগ নিতে চায় জামায়াত

sathi
sathi
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
পঠিত :
রাঙ্গুনিয়া বিএনপিতে বিভক্তি, সুযোগ নিতে চায় জামায়াত
নেজাম উদ্দীন,রাঙ্গুনিয়া সংবাদদাতা
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম-৭) আসনে বিএনপির একাধিক নেতা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইছেন। তাই এই আসনে বিএনপির কোন্দলের সুযোগ নিতে কৌশল আঁটছে জামায়াত। ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে জামায়াত একক প্রার্থী দিতে পারলে এই আসনে জামায়াতের ভোট মাঠ হবে উর্বর। 

গুরুত্বপূর্ণ আসনে এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।এই আসনে প্রবীণ রাজনীতিক সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী অন্যতম আলোচিত প্রার্থী। তিনি রাঙ্গুনিয়ার মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করছেন। এছাড়া বিএনপির অধ্যাপক কুতুব উদ্দীন বাহার, অধ্যাপক ইউনুছ চৌধুরী, আবু আহমেদ হাসনাত এবং যুবদল নেতা এসএ মুরাদ চৌধুরীর নামও শোনা যাচ্ছে। কুতুব উদ্দীন বাহার নিয়মিত কর্মীসভা ও গণসংযোগ করছেন, আর মুরাদ চৌধুরী লিফলেট বিতরণ এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে যাচ্ছেন। 

তবে দলের অভ্যন্তরে একাধিক প্রার্থীর উপস্থিতি ও বিভাজন এখনো সমাধান হয়নি, যা তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাবেক উপজেলা বিএনপির সেক্রেটারি অধ্যাপক ইউনুছ চৌধুরী জানান, দুর্দিনে দলের পাশে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি, হামলা মামলা লড়েছি কর্মীদের নিয়ে। আশা করি রাঙ্গুনিয়াবাসী আমাকে জয়ী করবে দল যদি মনোনয়ন দেয়। তবে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এখনো সমাধান হয়নি। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, রাঙ্গুনিয়া বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। 

অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে অধ্যক্ষ মাওলানা আমিরুজ্জামানকে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। তিনি প্রতীক হিসেবে দাড়িপাল্লা নিয়ে কাজ করছেন। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত তাদের শক্তিশালী তৃণমূল সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত কর্মীসভা চালাচ্ছেন। 

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দাতব্য কার্যক্রমের মাধ্যমে জামায়াতের প্রার্থী জনগণের মধ্যে একটি শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘জনগণ আমাকে সুযোগ দিলে রাঙ্গুনিয়াকে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উপহার দেবো।’ 

এই আসনে অন্যান্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন এলডিপি থেকে মো. নুরুল আলম তালুকদার এবং ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী ইকবাল হাসান। যদিও তাদের ভোটব্যাংক তুলনামূলকভাবে ছোট, তবুও তাদের উপস্থিতি মূল প্রার্থীদের ভোট ভাগাভাগিতে প্রভাব ফেলতে পারে। কিংবা তাদের জোট হলে ভোটের চিত্র পাল্টে যেতে পারে। এবি পার্টি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন আব্দুর রহমান মনির। 

তিনি জানান, রাঙ্গুনিয়াবাসী যদি সুযোগ দেয়, ইনশাআল্লাহ আমি ভালোকিছু উপহার দিবো। ইসলামী ফ্রন্টের ইকবাল হাসান ২০২৪ সালে হাসান মাহমুদ এর বিরুদ্ধে বিতর্কিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। শোনা যাচ্ছে এবারও তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। রাঙ্গুনিয়াবাসীর জন্য তিনি কাজ করে যাবেন বলে জানান। এর মধ্যে তিনি বিভিন্ন কর্মী সভা, মাহফিলে জনসংযোগে নেমেছেন।

জানা গেছে, রাঙ্গুনিয়া আসনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের ডা. ক্যাপ্টেন আবুল কাশেম জয়ী হলেও পরবর্তীতে মুসলিম লীগ, জাতীয় পার্টি এবং বিএনপিও এখানে বিজয়ী হয়েছে। ২০০৮ সালের পরে বিতর্কিত তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাছান মাহমুদ এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, প্রার্থীদের নিজস্ব কিছু শক্তিশালী ভোটব্যাংক রয়েছে। বিএনপির হুম্মাম কাদের চৌধুরী বয়স্ক ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের কাছে জনপ্রিয়, কুতুব উদ্দীন বাহার শিক্ষিত সমাজ ও স্থানীয় সমর্থকদের পছন্দের। অন্যদিকে, যুবদল নেতা মুরাদ চৌধুরী তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ করছেন। জামায়াতের মাওলানা আমিরুজ্জামান নির্ভর করছেন তাদের স্থায়ী ঘরোয়া ভোটব্যাংক এবং সুসংগঠিত তৃণমূলের উপর।

রাঙ্গুনিয়ার সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রার্থীর পরিচয় বা দলীয় আনুগত্যের চেয়ে উন্নয়নমূলক কাজই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় শিক্ষক মো. সেলিম বলেন, আমরা দল নয়, প্রার্থী ও তাদের পরিকল্পনাকেই গুরুত্ব দেবো। তরুণ ভোটাররা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছেন, আর কৃষকরা ফসলের ন্যায্য মূল্য ও নদী ভাঙন সমস্যার সমাধান চান। রাঙ্গুনিয়ায় নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে প্রথমে রয়েছে বিএনপির ঐক্য। 

বিএনপি যদি একটি গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে জামায়াতের সঙ্গে তাদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এক্ষেত্রে বিএনপি জিতবে। আর বিএনপির মধ্যে যদি বিভাজন তৈরি হয় অন্যরা সুবিধা পাবে। 

একাধিক প্রার্থীর কারণে বিএনপির ভোট বিভক্ত হলে জামায়াতের সংগঠিত ভোটব্যাংক তাদের জন্য সুবিধা তৈরি করবে। সেক্ষেত্রে জামায়াত বা অন্য দলের প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর রয়েছে জামায়াতের শক্ত অবস্থান। জামায়াত যদি তাদের শক্তিশালী তৃণমূলের উপর ভরসা করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে, তবে তারা এই নির্বাচনে একটি বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ক্রমেই এ আসনের হিসাব নিকাশ জটিল হচ্ছে। 

আগামীতে মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়া এবং প্রচারণার ধরণ এই আসনের রাজনৈতিক আবহকে আরও তীব্র থেকে তীব্রতর করবে। ভোটারদের চাহিদা পূরণে প্রার্থীরা কতটা সক্ষম হন, সেটাই এই নির্বাচনের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হবে।

জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সীমানা পরিবর্তনে শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নকে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) থেকে বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের সাথে যুক্ত করার ঘোষণায় পুরো উপজেলার মানুষ খুশী হয়েছে। শ্রীপুর-খরণদ্বীপসহ মোট ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে বোয়ালখালী উপজেলা গঠিত। শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের মোট আয়তন ৮ হাজার  ১৪৬ একর (৩২.৯৭ বর্গ কিলোমিটার)। 

শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ হাজার ৩৭৬ জন। রাঙ্গুনিয়া আসনে মোট ইউনিয়নের সংখ্যা ১৫টি। একটি পৌরসভাসহ এই ১৫ ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৯৪ হাজার ৭১৫জন। শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের ১৮ হাজার ৩৭৬ জন ভোটারসহ গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৯১জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১০৩টি। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গুনিয়া আসন থেকে শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নকে বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের সাথে যুক্ত করার ফলে চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়া সংসদীয় আসনে ভোটার সংখ্যা দাঁড়াবে ২ লাখ ৯৪ হাজার ৭১৫জন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।