নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসে এখন নির্বাচনমুখর পরিবেশ। শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোটের জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রশাসন।
নির্বাচন ঘিরে গেল দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে প্রচার-প্রচারণার হাঁকডাকে ক্যাম্পাস সরগরম থাকলেও আজ (মঙ্গলবার) ফাঁকা দেখা গেছে। এছাড়া ভোট ঘিরে নিরাপত্তার জন্য ক্যাম্পাসে সাদা পোশাকে এবং পোশাক পরা মিলিয়ে শতাধিক র্যাব সদস্য অবস্থান নিয়েছেন। তারা চাকসু ভবন পরিদর্শন করেছেন এবং ক্যাম্পাসে টহল দিচ্ছেন। পাশাপাশি আছেন পুলিশ সদস্যরাও।
নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে তেমন কোনো হুমকি দেখছে না বলে জানিয়েছেন র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে কোনো হুমকি নেই। শুধু বাইরে থেকে ইন্ধন না এলে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা যাবে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুলিশ, এপিবিএন প্রচুর পরিমাণে নিয়োগ থাকবে এবং আমাদের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের কমপক্ষে আটটি টহল দল সবসময় থাকবে এবং অতিরিক্ত রিজার্ভ ফোর্স আমরা রাখব, প্রয়োজন হলে তারাও আসবে। এছাড়াও আমাদের সাদা পোশাকে বেশ কিছু গোয়েন্দা সংস্থা থাকবে, গোয়েন্দার লোকজন থাকবে।
হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ছোট্ট একটা বিষয়কে নিয়ে স্পার্ক করে বড় ধরনের ঘটনা ঘটে যায়। তো এই ছোট ছোট ঘটনাকে স্পার্ক যাতে কেউ করতে না পারে বা বাইরে থেকে...মূলত স্টুডেন্টদের কোন সমস্যা নাই।’
তিনি বলেন,‘স্টুডেন্টরা তো আসলে নিজেদের ক্লাসমেট, ফ্রেন্ড বা বড় ভাই-ছোট ভাই। তো বাইরে থেকে কেউ যেন কোন ইন্ধন দিতে না পারে, সেটার বিষয়ে আমরা বেশি সতর্ক থাকব। আশা করছি স্টুডেন্টদের পক্ষ থেকে কোন সমস্যা নেই এবং বাইরেরটা কন্ট্রোল করতে পারলে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করা যাবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮টি বিভাগ ও ছয়টি ইনস্টিটিউটের ২৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী তাদের সংযুক্ত ১৪টি হল এবং একটি হোস্টেলের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ জমা দিলেও ভোটের আমেজে কমতি দেখা যাচ্ছে না।
চাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব এ কে এম আরিফুল হক সিদ্দিকী বলেন, “এখন পর্যন্ত সার্বিক পরিবেশ ভালো। শেষ মূহুর্তের যেসমস্ত টুকিটাকি কাজ থাকে, সেগুলো চলছে।”
তিনি বলেন, “নির্বাচন সম্পর্কিত বড়ো কাজগুলো ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপারসহ যা-যা প্রস্তুতি আছে, সেগুলোও সম্পন্ন হয়ে গেছে।”
১৯৭৩ সালের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, প্রতি বছর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। যদিও ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়বার ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে ।
এর মধ্যে প্রথম নির্বাচনটি হয় ১৯৭০ সালে; আর সবশেষ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। ফলে এখন যারা ভোট করছেন, তাদের কেউই আগে ছাত্র সংসদ দেখার সুযোগ পাননি।
১৯৭০ সালের প্রথম চাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন ছাত্রলীগের মোহাম্মদ ইব্রাহিম এবং জিএস হন ছাত্রলীগের আবদুর রব। ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়াতে তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সামনে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন চাকসু জিএস আবদুর রব। ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় চাকসু নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের শামসুজ্জামান হীরা ভিপি এবং জাসদ ছাত্রলীগের মাহমুদুর রহমান মান্না জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালের তৃতীয় চাকসু নির্বাচনে জাসদ ছাত্রলীগের এস এম ফজলুল হক ভিপি ও গোলাম জিলানী চৌধুরী জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের চতুর্থ চাকসু নির্বাচনে ভিপি হন জাসদ ছাত্রলীগের মাজহারুল হক শাহ চৌধুরী এবং জিএস হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের জমির চৌধুরী। ১৯৮১ সালে চাকসুর পঞ্চম নির্বাচনে ভিপি ও জিএস পদে নির্বাচিত হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেসময়ের নেতা জসিম উদ্দিন সরকার ও আবদুল গাফফার। ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ চাকসু নির্বাচনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের প্রার্থী জাতীয় ছাত্রলীগের নাজিম উদ্দিন ভিপি নির্বাচিত হন। আর জিএস নির্বাচিত হন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি আজিম উদ্দিন আহমদ।
এদিকে ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল পাওয়ার পর এবার চাকসু নির্বাচনেও জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে চায় ইসলামী ছাত্রশিবির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির মনোনীত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল ৩৩ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে। এ ইশতেহার ১২ মাসে পূরণ করার অঙ্গীকারও করেছে প্যানেলটি। তবে ছাত্রশিবিরের মতো নির্বাচনে জয়ী হতে মরিয়া ছাত্রদলসহ অন্য প্যানেলও। তারাও নানা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে জোর প্রচারণা চালিয়েছেন।
ছাত্রশিবিরের নেতারা বলছেন, তাদের প্যানেলে প্রার্থী নির্বাচনে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। দলীয় ছাড়াও এমন শিক্ষার্থীদের আনা হয়েছে, যারা নিজ নিজ অবস্থানে সেরা। তাই শিক্ষার্থীরা সেরা প্রার্থীদেরই ভোট দিবে বলে আশাবাদী তারা। প্যানেলের প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে নিজেদের ইশতেহার তুলে ধরে প্রচারণা চালিয়েছেন। এর পাশাপাশি অনলাইন প্রচারণায়ও তারা সমানভাবে অংশ নিয়েছেন।
ছাত্রশিবিরের প্যানেলটির ভিপি পদপ্রার্থী মো. ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দেবে। এখানে প্যানেল মুখ্য বিষয় না, মূখ্য বিষয় যোগ্য প্রার্থী। আমাদের প্যানেলে বৈচিত্র্য আছে। এখানে যেমন ছাত্রশিবিরের ভাইয়েরা আছেন, তেমনি অন্যান্য প্লাটফর্মের সেরা শিক্ষার্থীরাও আছেন। প্যানেলের সবাই যার যার জায়গায় দক্ষ। আমরা মনে করি শিক্ষার্থীরা এ বিষয়টি বিবেচনা করবে।
অন্যদিকে জয়ের ব্যাপারে একইভাবে আশাবাদী ছাত্রদলের প্যানেলসহ অন্যান্য ১২ প্যানেলের প্রার্থীরাও। জয়ী হতে তারাও সকাল থেকে রাত অবধি ক্যাম্পাসজুড়ে চষে বেড়িয়েছেন। শিক্ষার্থীদের আশার বাণী শুনিয়েছেন। তুলে ধরেছেন নিজেদের ইশতেহারও।
ছাত্রদলের প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, ‘যখন ক্যাম্পাসে নির্বাচনী আলাপ ছিল না, নির্বাচন হওয়ার সুযোগ ছিলো না, তখনো কথা বলেছি, আওয়াজ তুলেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছি৷ সেটি শুধু দায়বদ্ধতার ও বিবেকের তাড়না থেকে করেছি। ইশতেহারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, চাওয়াগুলোই তুলে ধরেছি। শিক্ষার্থীরা এখন সচেতন। তারা যোগ্য খুঁজেই ভোট দেবে।
উল্লেখ্য, গেল ২৮ অগাস্ট চাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এরপর ১ সেপ্টেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর যাচাই-বাছাই শেষে ১১ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। একই মাসের ১৪ তারিখ শুরু হয় মনোনয়ন পত্র বিতরণ। যা শেষ হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে ২১ সেপ্টেম্বর প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখ প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর নির্বাচনের জন্য ১২ অক্টোবর দিন ঠিক করা হলেও পরে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সেটি পিছিয়ে ১৫ অক্টোবর করা হয়।