দক্ষিণ পূর্ব

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: পুড়ে গেল প্রায় ৫০০ ঘর

RAFIQ HYDER
RAFIQ HYDER
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারী ২০২৬
পঠিত :
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: পুড়ে গেল প্রায় ৫০০ ঘর
দক্ষিণপূর্ব ডেস্ক 

কক্সবাজারের উখিয়ার শফিউল্লাহ কাটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬৫টি স্থাপনা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪৪৮টি বসতঘর, ১০টি লার্নিং সেন্টার, দুটি মসজিদ ও একটি মক্তব। 

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) গভীর রাতে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৪ ব্লকে এ ঘটনা ঘটে।

রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে ক্যাম্পের বাসিন্দারা গভীর ঘুমে ছিলেন। হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাঁশ, ত্রিপল ও প্লাস্টিক শিটে তৈরি ঘনবসতিপূর্ণ শেডগুলোতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রবল বাতাসের কারণে আগুন আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। চারপাশে কালো ধোঁয়া ও তীব্র তাপে মানুষজন দিশেহারা হয়ে পড়েন।
প্রাণ বাঁচাতে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের নিয়ে রোহিঙ্গারা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। অনেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, খাবার কিংবা ওষুধ বের করার সুযোগ পাননি।

ডি-৪ ব্লকের বাসিন্দা লাইলা বেগম বলেন, ‘ঘুমের মধ্যে হঠাৎ আগুন আর চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায়। সন্তানদের নিয়ে শুধু প্রাণ বাঁচাতে দৌড়েছি। ঘরের সবকিছু পুড়ে গেছে।’

ডি-৩ ব্লকের বাসিন্দা মৃত আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী, ৭০ বছর বয়সী রাজিয়া বেগম বলেন, ‘আমি বৃদ্ধ মানুষ, দৌড়াতে পারি না। অন্যরা সাহায্য না করলে হয়তো বাঁচতাম না। এই বয়সে আবার সব হারাতে হবে ভাবিনি।’

ডি-২ ব্লকের প্রতিবন্ধী মোহাম্মদ বলেন, ‘আগুন লাগার সময় বের হতে খুব কষ্ট হয়েছে। অন্যরা সাহায্য না করলে হয়তো আগুনেই মারা যেতাম। এখন খোলা আকাশের নিচে আছি।’

একই ব্লকের হাফেজ কলিম উল্লাহ বলেন, ‘আমার কিতাব, বই, রেডিও—সব পুড়ে গেছে। এগুলো দিয়েই আমি শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দিতাম।’

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে ডি-৪ ব্লকের একটি লার্নিং সেন্টার এলাকা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খবর পেয়ে কক্সবাজার সদর, উখিয়া, রামু ও টেকনাফ থেকে আটটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। ক্যাম্পের সরু রাস্তা, পানির স্বল্পতা ও প্রবল বাতাস আগুন নেভাতে বড় বাধা সৃষ্টি করে। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার চেষ্টায় ভোর পৌনে ছয়টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মো. মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বসতঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’

উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এ অগ্নিকাণ্ডে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা বর্তমানে পাশের লার্নিং সেন্টার, মসজিদ, মক্তব ও খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। খাবার, বিশুদ্ধ পানি, কাপড়, ওষুধ ও শিশু খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আসমা বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে।’

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। ক্যাম্প এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।’

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হলে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

এর আগে গত ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বরও দুটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে পরিকল্পিত নাশকতা, নিরাপত্তা ঘাটতি ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহল ক্যাম্পে নজরদারি, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও রান্নার চুলা ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোরতা আরোপের তাগিদ দিয়েছে।

রহা

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।