চট্টগ্রাম নগরীর বহুল আলোচিত শিশু আলীনা ইসলাম আয়াত হত্যা মামলায় প্রধান আসামি আবির আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং লাশ গুমের অপরাধে অতিরিক্ত পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আবির আলী আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
আদালত সূত্র জানায়, গত শনিবার মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মোট ৩৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এই রায় দেন।
মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) জালাল উদ্দিন জানান, শিশু আয়াতকে হত্যার দায়ে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আবির আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং মরদেহ টুকরো টুকরো করে গুম করার দায়ে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর নগরীর ইপিজেড থানাধীন দক্ষিণ হালিশহরের নয়ারহাট এলাকায় নিজ বাসার পাশ থেকে নিখোঁজ হয় চার বছর ১১ মাস বয়সী শিশু আলীনা ইসলাম আয়াত। এ ঘটনায় তার বাবা সোহেল রানা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তদন্তে বেরিয়ে আসে, প্রতিবেশী আবির আলী মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে আয়াতকে অপহরণ করেছিলেন। তবে অপহরণের পর শিশুটিকে কোথাও লুকিয়ে রাখতে না পেরে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। এরপর মরদেহ নিজের বাসায় নিয়ে ছয় টুকরো করেন।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ১৬ নভেম্বর সকালে মরদেহের তিনটি অংশ আউটার রিং রোড সংলগ্ন বে-টার্মিনাল এলাকার সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। একই দিন রাতে বাকি তিনটি অংশ আকমল আলী রোডের একটি স্লুইস গেট সংলগ্ন নালায় ফেলে দেয় আবির।
ঘটনার তদন্তের একপর্যায়ে ২৪ নভেম্বর আবির আলীকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। পরদিন আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ নভেম্বর আকমল আলী ঘাট এলাকার একটি গর্ত থেকে আয়াতের দুই পায়ের অংশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন একই এলাকা থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক কিশোরকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিচার বর্তমানে শিশু আদালতে চলমান রয়েছে।
মামলার তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর পিবিআইয়ের তৎকালীন পরিদর্শক মনোজ কুমার দে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর ২০২৪ সালের ৩০ মে আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।
আদালত সূত্র জানায়, মামলায় ৫০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ, জবানবন্দি ও উপস্থাপিত তথ্য পর্যালোচনা করে আদালত এই রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত আয়াতের স্বজনরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপক্ষও রায়কে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন হিসেবে অভিহিত করেছে।
আরএইচ