দক্ষিণ পূর্ব

সিসিটিভি ফুটেজে খুনিরা স্পষ্ট, ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মামলা হয়নি, পরিবারের আহাজারি

Riayad
Riayad
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬
পঠিত :
সিসিটিভি ফুটেজে খুনিরা স্পষ্ট, ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মামলা হয়নি, পরিবারের আহাজারি

ছবি

চট্টগ্রামের রাউজানে দিন-দুপুরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হলো যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে খুনিদের মুখ, হাতে থাকা অস্ত্র সবই ধরা পড়েছে। পুলিশ ৫ জনকে শনাক্তও করেছে। তবু ঘটনার ২৪ ঘণ্টার বেশি পার হয়ে গেলেও কাউকে আটক করা যায়নি, মামলাও হয়নি।

 

গত শনিবার দুপুরে রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজার এলাকায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে অস্ত্রধারীরা গুলি করে হত্যা করে। স্থানীয়দের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের পুরো দৃশ্য ধরা পড়ে সিসিটিভিতে।

 

ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানায়, চট্টগ্রামের ত্রাস হিসেবে পরিচিত রুদ্র সাজ্জাদ বাহিনীর অনুগত রায়হান বাহিনীর সদস্যরা এই হত্যা মিশনে অংশ নেয়। শনাক্ত ৫ জনের মধ্যে রাউজানের কদলপুরের মোহাম্মদ ইলিয়াস ওরফে দামা ইলিয়াস, দিদারুল আলম ওরফে দিনার, রাউজান পৌরসভার ফরেস্ট অফিস এলাকার মোহাম্মদ ইউসুফ, রাউজান সদর ইউনিয়নের পূর্ব রাউজান এলাকার মোহাম্মদ জাহেদ ও মোহাম্মদ আবছার রয়েছেন।

 

তিনজনের হাতে ছিল পিস্তল, দুজনের কাছে শটগান। ইলিয়াস ও দিদারুল প্রথমে মাকসুদুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এরপর ইউসুফ, জাহেদ ও আবছার দৌড়ে গিয়ে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করেন।

 

 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান গডফের সদস্যরা। স্থানীয়রা জানান, এলাকার ত্রাস রায়হান বাহিনীর সদস্যরাই মাকসুদুল হত্যায় জড়িত। রায়হান রাউজানের এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরীর অনুগত হিসেবে পরিচিত এবং তিনি ও তার লোকজন বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

 

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খুনিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

 

রাউজান থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের বিরুদ্ধে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও নগরীর বিভিন্ন থানায় ১২টি হত্যাসহ ২৪টি মামলা রয়েছে। তার সহযোগী দামা ইলিয়াসের বিরুদ্ধে ৫টি হত্যাসহ ১৮টি মামলা, ইউসুফের বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ ৪টি মামলা রয়েছে। দিনার, জাহেদ ও আবছারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা ঝুলছে।

 

 

রাউজানের পূর্বদিকের সীমান্তে উঁচু-নিচু দুর্গম পাহাড়। স্থানীয়দের ধারণা, সেসব পাহাড়েই রাউজান ও পার্বত্য এলাকার সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাউজানের পাহাড়তলী, কদলপুর, সদর ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে যত খুন, সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়েছে, তার বেশিরভাগ ঘটনায় পাহাড় থেকে আসা সন্ত্রাসীরা জড়িত। মিশন শেষ করেই তারা আবার পাহাড়ের গোপন আস্তানায় ফিরে যায়। মাকসুদুল হত্যার খুনিরাও হত্যার পর পাহাড়ে পালিয়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

হত্যাকাণ্ডের পেছনে কণ্ঠসুরী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও আধিপত্য বিস্তারকে অনেকে কারণ হিসেবে দেখছেন। স্থানীয়রা জানান, রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী বাজার-সলং চম্পাতলী ঘাট ও রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলার ঘাট এলাকার বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন নিহত মাকসুদুল। বেতাগী ইউনিয়নের বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান বলেন, খুনের তদন্তে বালু নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা উচিত।

 

পরিবারের আহাজারি: ২৪ ঘণ্টা পার, মামলা নেই

 

নিহতের বড় ভাই, বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন বলেন, “আমাদের পরিবারের সবাই এখন শোকাহত। বলার কিছু নেই। আমার ভাইয়ের কোনো শত্রু নেই। কারা, কেন তাকে এভাবে হত্যা করেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করে বের করুক। সিসিটিভি ফুটেজে যাদের দেখা গেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করলেই খুনের কারণ বেরিয়ে আসবে।”

 

গতকাল রোববার বেলা ৩টায় বেতাগী ইউনিয়নের চম্পাতলী ঈদগাহ মাঠে মাকসুদুলের জানাজায় মানুষের ঢল নামে। স্বজন ও দলের নেতাকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। জানাজার আগে বিএনপির নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খুনের ২৪ ঘণ্টার বেশি পার হলেও মামলা হয়নি, চিহ্নিত আসামিরাও গ্রেপ্তার হয়নি।

 

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মোহাম্মদ জসিম বলেন, “সন্ত্রাসীদের কোনো দলনেতা নেই। তারা রাজনৈতিক ছত্রছায় অপরাধ করে। রাজনীতিবিদদেরও বুঝতে হবে, লাগি সন্ত্রাসীদের বুঝেশুনে কাছে টানতে হবে। আমি সন্ত্রাসীদের পক্ষে নই। যুবদল নেতা মাকসুদুল হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”

 

রাউজানের এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরী বলেন, “সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। রাউজানে যারা চাঁদাবাজি করে, মানুষ খুন করে তাদের পুলিশ ধরছে না কেন? অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে গ্রেপ্তার করতে তো কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।”

 

রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ওসি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “খুনের ঘটনায় মামলা হবে রাউজান থানায়। আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।”

 

রাঙ্গুনিয়া-রাউজান সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, “অস্ত্র হাতে যে পাঁচজনকে দেখা গেছে, তারা বিদেশে পলাতক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী রায়হান বাহিনীর ক্যাডার। তাদের পরিচয় বের করা হয়েছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমরা খুনিদের গ্রেপ্তারে কাজ করছি।”

 

সিসিটিভি ফুটেজ আছে, ৫ জন শনাক্ত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে। তবু ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও অভিযানে কেউ আটক হলো না, মামলাও হলো না। পাহাড়ের আস্তানা থেকে নেমে এসে প্রকাশ্যে খুন করে আবার পাহাড়ে ফিরে যাওয়া - এই সংস্কৃতি কবে থামবে? জনগণের প্রশ্ন: খুনিরা এতটাই শক্তিশালী, নাকি আইনের হাত এতটাই দুর্বল?

 

এমএ

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।