মাত্র ১৭ দিন আগে থেমে গেছে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষের জীবন। সেই সঙ্গে থমকে গেছে ২৮ বছর বয়সী রোকশানা বেগমের স্বপ্ন, অনিশ্চয়তায় ঢেকে গেছে তাঁর দুই শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ। স্বামীর মৃত্যুর পর যখন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল সংগ্রামের, তখন মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
সিলেটের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে চট্টগ্রামে বসবাস করেন রোকশানা বেগম। তাঁর স্বামী সুমন আহমেদ ছিলেন একজন রিকশাচালক। প্রতিদিনের উপার্জনের ওপর নির্ভর করেই চলত চার সদস্যের সংসার। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় তিন মাস অসুস্থ থাকার পর ৩৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুতে শুধু একজন জীবনসঙ্গীকেই হারাননি রোকশানা, হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎসও।
রোকশানার বড় মেয়ে আয়েশা আক্তারের বয়স মাত্র ৮ বছর, আর ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেনের বয়স ৩। বাবার মৃত্যুর পর শিশু দু’টি হয়তো এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি তাদের জীবনে কী বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ইতোমধ্যে তাদের পরিবারকে কঠিন এক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
স্বামীর চিকিৎসার পেছনে পরিবারের সামান্য সঞ্চয়ও শেষ হয়ে যায়। এরপর বাসাভাড়া, খাবার, সন্তানদের প্রয়োজনীয় খরচ এবং দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করা রোকশানার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। আত্মীয়স্বজনের সীমিত সহায়তায় কয়েক দিন চললেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়তে থাকে।
অবশেষে শেষ আশ্রয় হিসেবে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার কাছে সহায়তার আবেদন করেন তিনি। আবেদনে উল্লেখ করেন, স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবার নিয়ে তিনি চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন। সংসার চালানোর মতো কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস নেই। মানবিক বিবেচনায় আর্থিক সহায়তা এবং সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন জানান তিনি।
রোকশানার আবেদনপত্রের প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছিল এক সদ্য স্বামীহারা নারীর অসহায়ত্ব, দুই শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামের গল্প।
আবেদনটি জেলা প্রশাসকের নজরে এলে তিনি বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করেন। বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রোকশানা বেগমকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারালে শুধু আর্থিক সংকটই নয়, পুরো পরিবার গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু সন্তানদের শিক্ষা, পুষ্টি ও ভবিষ্যৎ তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সহায়তা পাওয়ার পর আবেগাপ্লুত রোকশানা বেগম জেলা প্রশাসকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ডিসি স্যারের কাছে আজই আবেদন নিয়ে দেখা করেছিলাম। অনেক ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় নিয়ে আমার সব কথা শুনেছেন। আমার সংসার কীভাবে চলছে, সন্তানদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, “অনেক মানুষের কাছে গিয়েছি, কিন্তু কেউ সেভাবে পাশে দাঁড়াননি। ডিসি স্যারের সঙ্গে দেখা করার পরপরই তিনি আমাকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। এই সহায়তা আমার জন্য অনেক বড় সাহসের জায়গা তৈরি করেছে।”
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “রোকশানার জন্য এই সহায়তা হয়তো তাঁর সব সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু স্বামী হারানোর পর যখন চারপাশ অন্ধকার মনে হচ্ছিল, তখন এই সহায়তা তাঁকে অন্তত একটি বার্তা দিয়েছে—তিনি একা নন।”
তিনি আরও বলেন, “কখনো কখনো একটি আবেদনপত্র শুধু সাহায্য চাওয়ার কাগজ নয়; সেটি হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা। সেই চেষ্টার প্রতি সাড়া দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব।”
স্বামীকে হারানোর মাত্র ১৭ দিনের মাথায় জীবনসংগ্রামের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করা রোকশানা বেগমের জন্য এই সহায়তা হয়তো সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে তাঁর দীর্ঘ পথচলা এখনো বাকি। সেই পথচলার শুরুতে প্রশাসনের এই মানবিক সহায়তা তাঁকে নতুন করে বাঁচার সাহস ও ভবিষ্যতের আশা জুগিয়েছে।
আরএইচ