দক্ষিণ পূর্ব

হাটহাজারীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নানা দুর্নীতি

shakhawat sohan
shakhawat sohan
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৫
পঠিত :
হাটহাজারীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নানা দুর্নীতি
মো. আবু শাহেদ, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরটি যেন দুর্নীতির আখড়া।আর্সেনিকমুক্ত সুপেয় পানি নিশ্চিতে গভীর নলকূপ স্থাপন, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন নির্মাণ, স্কুলে ওয়াশব্লক ও বিভিন্ন স্টেশনে হ্যান্ডওয়াশ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সাবেক এমপি ব্যারিস্টার আনিসুল এর সময়ে ১৮শত ২০টি গভীর নলকূপ স্থাপনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে রীতিমত তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দকৃত ৫০ শতাংশ নলকূপ স্থাপনের স্থান নির্বাচন করবেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। বাকি ৫০ শতাংশ স্থান নির্বাচন করবে ইউনিয়ন ওয়াটসন কমিটি।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত হাটহাজারীতে ১৮শত ২০টি নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। গত সরকার পতনের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮টি গভীর নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট ১৯শত ৮৮টি নলকূপের মূল্য ২১ কোটি ৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা। চলতি অর্থবছরেও নলকূপ স্থাপনে রয়েছে নানা অনিয়ম। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নলকূপ দেওয়া হয়। কিছু কিছু ইউনিয়ন ওয়ার্ডে ৭-৮ টি করে নলকূপ দেওয়া হয়েছে, আর কোন কোন ইউনিয়ন ওয়ার্ডে একটি নলকূপও দেওয়া হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দপত্রে এক জায়গার নলকূপ অন্য জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে। আত্মীয়করণে নিজেদের পছন্দনীয় ব্যক্তির বাড়িতে একাধিক নলকূপ স্থাপন করা হয়। বরাদ্দপ্রাপ্ত অনেকের কাছ থেকে সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি পরিচয়ে ১০ হাজার ২শত টাকার স্থলে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। নলকূপ স্থাপনে ৫৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ এনে ফতেপুর এলাকার লাকী আক্তার জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।

জানা যায়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি নলকূপের বিপরীতে বরাদ্দপ্রাপ্তদের সোনালী ব্যাংকের চালানের মাধ্যমে ১০ হাজার ২০০ টাকা জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু দালাল চক্রের মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। দেওয়া হচ্ছে না বৈদ্যুতিক বিল। আবার নলকূপ স্থাপনে নিয়োজিত শ্রমিকদের খাওয়া খরচসহ নানা অজুহাতে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। উপজেলার চিকনদন্ডি ইউনিয়ন এলাকার মৃত নুরুল আমিনের ছেলে মো. রাসেল জানান, তার বাড়িতে নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। সরকারি ফি ছাড়াও নেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত টাকা।


এদিকে, নলকূপ স্থাপনের বিপরীতে ৫৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ এনে লাকী আক্তার উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বরাবর লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, নলকূপ স্থাপনের জন্য তার কাছ থেকে ৫৫ হাজার টাকা নিয়েছেন তারই দেবর বাদশা। তিনি সাবেক এমপি ব্যারিস্টার আনিসুল এর প্রতিনিধি সৈয়দ আবুল কালামকে এই টাকা দিতে হবে বলে জানিয়েছিলেন। লাকী আক্তার বলেন, 'নলকূপ স্থাপনের পর জানতে পারি সরকারি ফি মাত্র ১০ হাজার ২শত টাকা। অথচ আমার কাছ থেকে অতিরিক্ত ৪৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। আমি লিখিত অভিযোগ করেছি, কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি। টাকাও ফেরত পাইনি।' উল্টো এমপির চাচা আকবর হায়দার চৌধুরীর কাছে পাঠিয়ে দেন।

সূত্রে আরও জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ৯১টি ওয়াশব্লক স্থাপন করা হলেও এখনো অধিকাংশ বিদ্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়নি। পূর্বে যেগুলো বিদ্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে সেগুলোর দেয়াল ও ছাদ পেটে পড়ছে। এতে বেড়েছে শিক্ষক ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ। অভিযোগ রয়েছে, চিকনদন্ডি দরবেশীয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশব্লকটির দেওয়াল ও ছাদ পেটে পড়ছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বেগম দিলারা আলো জানান, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণ করেছে। ছাদ ও দেওয়াল পেটে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা অনেক দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। রংগীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা দিল আফরোজা বেগম বলেন, ২১সালে নতুন ভবনের কাজ শুরু হলেও এখনো বুঝিয়ে দেয়নি। ওয়াশব্লক না থাকায় আমরা পুরনো একটা টয়লেট মেরামত করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ডক্টর মুহম্মদ ইউনুস এর প্রতিষ্ঠিত ও রাষ্ট্রপতি পুরুস্কার প্রাপ্ত জোবরা নবযুগ তেভাগা খামার বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের পাশে জোবরা খামার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একই অভিযোগ।

প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে আরো জানা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গুমানমর্দন ইউনিয়ন এলাকায় সরকারি আশ্রায়নের সামনে পাওয়ার হাউজ (স্কিম হাউজ) নামে একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। যার মূল্য ২কোটি ২০লাখ টাকা। অর্থবছরের শেষের দিকেও তা এখনো বুঝিয়ে দিতে পারেনি উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

হাটহাজারী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, নলকূপ স্থাপনে অনিয়ম হয়নি। তালিকার মাধ্যমে হয়েছে। ওয়াশব্লক গুলোর কাজ চলছে। খুব শিগগিরই বুঝিয়ে দেওয়া হবে। হ্যা তবে এক মহিলার অভিযোগ পেয়েছিলাম। বিষয়টি আমি এমপি স্যারকে জানিয়েছিলাম। স্যারের চাচা আলী আকবর হায়দার চৌধুরী বিষয়টির সমাধান করার কথা। পরে ওই মহিলা আর যোগাযোগ করেননি।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।