চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পূর্ব চাম্বল গ্রামের বাসিন্দা মীর মজিবুর রহমান খান জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন রান্নার কাজ করে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই মানুষটির জীবনসঙ্গীও একে একে হারিয়ে যায়। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন তিনি। পরে দ্বিতীয় স্ত্রীও ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০২২ সালে মারা গেলে ফটিকছড়িতে একাকী জীবন কাটাতে শুরু করেন মজিবুর রহমান।
তবে জীবনের শেষ অধ্যায়ে সেই একাকীত্বই তার জন্য হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্পত্তি বিক্রি করে মেয়ে সালমা খানমকে টাকা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বাবার প্রতি ক্ষোভ জন্ম নেয় বড় ছেলে বেলাল হোসেনের। সময়ের সঙ্গে সেই ক্ষোভ ভয়ংকর প্রতিশোধের পরিকল্পনায় রূপ নেয়। বাবাকে সরিয়ে দিতে তিনি বেছে নেন এক অভিনব কৌশল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিজের এক পূর্বপরিচিত প্রেমিকাকে ব্যবহার করেন বেলাল। ওই নারী মোবাইল ফোনে মজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। দীর্ঘদিনের কথোপকথনে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়। আর সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই ফাঁদ পাতা হয় প্রবীণ এই ব্যক্তির জন্য।
২০২৪ সালের ৬ জুন ফটিকছড়ি থেকে চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লায় মেয়ে সালমা খানমের বাসায় বেড়াতে আসেন মজিবুর রহমান। পরদিন সকালে প্রেমিকার আমন্ত্রণে বাকলিয়ার আনন্দ সাবান ফ্যাক্টরি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় যান তিনি। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন বেলালের ভায়রা ভাই আব্দুল জলিল।
তদন্তে জানা যায়, ওই বাসায় মজিবুর রহমানকে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি অর্ধচেতন হয়ে পড়েন। বিকেলের দিকে আব্দুল জলিল ও ওই নারী তাকে সিএনজি অটোরিকশায় করে সিআরবি এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে জলিলের পাহারায় রেখে বেলাল লালদীঘি এলাকা থেকে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে আনেন।
এরপর শুরু হয় মজিবুর রহমানের জীবনের শেষ যাত্রা।
মাইক্রোবাসে করে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানোর পর সন্ধ্যার দিকে হালিশহর আর্টিলারি সেন্টারের বিপরীতে সিডিএ আউটার লিংক রোড এলাকায় গাড়ি থামানো হয়। সেখানে ছেলে বেলাল হোসেন ও সহযোগী আব্দুল জলিল মিলে মজিবুর রহমানের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। পরে মরদেহ রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়ে ফেলে রেখে পালিয়ে যান তারা।
এদিকে বাবার কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মেয়ে সালমা খানম। প্রথমে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পর ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। পরে একই বছরের নভেম্বরে আদালতে অপহরণ মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
দীর্ঘ তদন্তের একপর্যায়ে গত ১৩ জুন কর্ণফুলীর মইজ্জারটেক এলাকা থেকে মূল পরিকল্পনাকারী বেলাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বাবাকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন ভোরে মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সহযোগী আব্দুল জলিলকে।
তদন্তে উঠে আসে আরও মর্মান্তিক তথ্য। হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর, ২০২৪ সালের ৯ জুন রাতে হালিশহর থানা-পুলিশ পাশের জঙ্গল থেকে সাদা লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি পরা এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছিল। পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করে এবং আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে মরদেহটি দাফন করা হয়। পরে কোনো সূত্র না পাওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়।
কিন্তু দুই বছর পর পিবিআইয়ের তদন্তে প্রকাশ পায়, অজ্ঞাত পরিচয়ে দাফন হওয়া সেই মরদেহটি ছিল নিখোঁজ মীর মজিবুর রহমান খানের।
সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে ছেলে কর্তৃক বাবাকে হত্যার এই ঘটনা চট্টগ্রামে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। পিবিআই জানিয়েছে, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আর এইচ