দক্ষিণ পূর্ব

হালদায় চাষাবাদে বিষের ছড়াছড়ি, বালু উত্তোলনে হুমকিতে প্রজনন ক্ষেত্র

RAFIQ HYDER
RAFIQ HYDER
প্রকাশ : ৯ অক্টোবর ২০২৫
পঠিত :
হালদায় চাষাবাদে বিষের ছড়াছড়ি, বালু উত্তোলনে হুমকিতে প্রজনন ক্ষেত্র
ফটিকছড়ি প্রতিনিধি:

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মিঠাপানির মাছের প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী আবারও মারাত্মক হুমকির মুখে। নদীর দুই তীরে দেদারসে চলছে শীতকালীন সবজির চাষাবাদ আর সেই চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত কীটনাশক। পাশাপাশি রাতের অন্ধকারে নদীর বুকে বালি উত্তোলনের অপতৎপরতা হালদার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছে।

 বৃহস্পতিবার ( ৯ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীপাড়ের চরজুড়ে চাষ হচ্ছে মুলা, বেগুন, সীম, টমেটোসহ নানা শীতকালীন সবজি। এসব জমিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ডিডিটি, ফুরাডানসহ বহু আগেই নিষিদ্ধ ঘোষিত কীটনাশক। বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসব রাসায়নিক ধুয়ে গিয়ে মিশে পড়ছে হালদার পানিতে, যার ফলে নদীর অক্সিজেনমাত্রা কমে যাচ্ছে এবং মা মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, বৃষ্টির পানিতে এসব বিষ নদীতে মিশে হালদার পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। পাশাপাশি রাতে কিছু চক্র গোপনে বালু উত্তোলন করছে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো: নজরুল ইসলাম বলেন,
হালদা থেকে বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।আজ দুটি স্পটে অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। তবে সূয়াবিল এলাকায় রাতের বেলায় চোরাকারবারিদের ধরতে স্থানীয় সহযোগিতার ঘাটতি রয়েছে।

এ বিষয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো:মোজাম্মেল হক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা গবেষক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, হালদায় বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ। এতে নদীর তলদেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, মাছের ডিম ছাড়ার স্থান ধ্বংস হচ্ছে। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে হালদার প্রজনন ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পাশাপাশি হালদা পাড়ের কৃষকদের অর্গানিক সার ও কীটনাশকবিহীন চাষাবাদে উৎসাহিত করতে হবে, না হলে বিষাক্ত পদার্থ নদীতে মিশে মা মাছের মৃত্যু ঘটবে।

ফটিকছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, কৃষকদের একবারে চাষ থেকে বিরত রাখা সম্ভব নয়। তবে ধীরে ধীরে তাদের অর্গানিক চাষে অভ্যস্ত করতে হবে, যাতে ফসল উৎপাদনও টিকে থাকে, আবার পরিবেশও রক্ষা পায়। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষতি সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি।

মানবাধিকার নেতা ও সংগঠক অ্যাডভোকেট ইসমাঈল গণি বলেন, হালদা শুধু নদী নয়,
এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক মা মাছের ভাণ্ডার। এখানে যারা চাষ করছেন, তাদের কীটনাশক ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। এসব বিষ নদীর প্রাণঘাতী ক্ষতি করছে। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করতে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।

একটি কীটনাশক কোম্পানির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে শুধু মাটি নয়,পানি, বাতাসও দূষিত হচ্ছে। এসব রাসায়নিক মানুষের মধ্যে ক্যান্সার, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, এমনকি বন্ধ্যাত্বের মতো ভয়াবহ রোগের জন্ম দিচ্ছে।

নাজিরহাট হেলথ কমপ্লেক্সের সাবেক পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সৌনেম বড়ুয়া বলেন,
 কীটনাশক ব্যবহারে সঠিক পদ্ধতি না মানলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়। বায়োকন্ট্রোল পদ্ধতি ব্যবহারে পরিবেশ ও মানুষ-দুজনই সুরক্ষিত থাকতে পারে।

স্থানীয় কৃষক ইউনুস ও শরীফ জানান, আমরা বেশি ফলনের আশায় কীটনাশক ব্যবহার করি। তবে এখন বুঝতে পারছি এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। সরকারি সহায়তা পেলে অর্গানিক চাষে আগ্রহী হবো।

অন্যদিকে নাজিরহাট সূয়াবিল ও কাজিরহাট এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, কিছু অসাধু চক্র একদিকে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছে, আবার অন্যদিকে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চালাচ্ছে। প্রশাসনের অভিযান শেষ হলেই আবার তারা আগের মতো কাজ শুরু করে।

সচেতন ফটিকছড়িবাসীর দাবি- হালদা নদীতে অবৈধ বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। চরের চাষাবাদে কীটনাশক ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। কৃষকদের অর্গানিক চাষে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা বাড়াতে হবে। নদী সংরক্ষণে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে।

পরিবেশকর্মী, শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার নেতাদের আহ্বান- “হালদাকে বাঁচাও, প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দাও প্রাণ”। হালদা নদীকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি নদী নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করা।

রহা

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।