দক্ষিণ পূর্ব

ভারতের পরিকল্পনায় হাসিনার প্রতিহিংসার শিকার আসলাম চৌধুরী

Masud forhan
Masud forhan
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
পঠিত :
ভারতের পরিকল্পনায় হাসিনার প্রতিহিংসার শিকার আসলাম চৌধুরী
মাসুমুল ইসলাম

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, ব্যবসায়ী লায়ন আসলাম চৌধুরীর জীবনের গত এক দশক যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। প্রায় ৯ বছর (৩ হাজার দিন) কারাগারে কাটিয়ে এখন তিনি মুক্ত, কিন্তু সেই মুক্তি যেন শুধুই শারীরিক—রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এখনও তিনি একপ্রকার নিঃস্ব। বিএনপির অভিযোগ, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর প্রত্যক্ষ পরামর্শে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে তাকে রাজনৈতিকভাবে বন্দি করে এবং অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।

আন্দোলনের মূর্ছনায় উঠে আসা এক নেতা

২০১৩ সালের শেষ দিকের কথা। সারাদেশে চলছিল নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে তীব্র আন্দোলন। সেই সময় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হয়ে ওঠে প্রতিরোধের প্রতীক। ঢাকামুখী যানবাহনের প্রধান সড়ক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক কার্যত অচল করে দেয় বিএনপি-জামায়াত জোট। আর এই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন আসলাম চৌধুরী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথে অবস্থান, অবরোধ, বিক্ষোভ, গণসমাবেশ—প্রতিদিনই মাঠে ছিলেন তিনি। সরকার তখন বুঝতে পারে, আসলাম চৌধুরী ও সীতাকুণ্ডের নেতৃত্বে আন্দোলন যদি ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই তাকে গ্রেপ্তারের পরিকল্পনা করা হয়। আসলাম চৌধুরী এক অনুষ্ঠানে বলেন, বিএনপির দুর্বার আন্দোলনে ২০১৩ সালেই সরকার পরিবর্তন হয়ে যেত। তবে কেন্দ্রীয় ২-৩ জন নেতার কারণে তা হয়নি। 

পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শুরু

২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি সীতাকুণ্ডের আন্দোলনকে ‘নরককুণ্ড’ আখ্যা দেন এবং আসলাম চৌধুরীর নামোল্লেখ করে বলেন, ‘এইসব সহিংসতা ও নৈরাজ্যের নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপি-জামায়াত।’ এরপর থেকেই একের পর এক মামলা এবং হয়রানি শুরু হয় তার বিরুদ্ধে। এর আগে তিনি ২০১৪ সালে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্ত হন। ২০১৬ সালের ১৫ মে রাতে ঢাকার কুড়িল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। প্রথমে ৫৪ ধারায় আটক দেখানো হলেও, পরে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। বলা হয়, তিনি ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির এক নেতার সঙ্গে বৈঠক করে সরকার পতনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। যদিও সেই ইসরায়েলি নেতা মেন্দি এন সাফাদি পরে গণমাধ্যমে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

৭৬টি মামলা, কারাগারে কাটে তিন হাজার দিন

আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে একে একে ৭৬টি মামলা দায়ের করা হয়। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা—দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বারবার রিমান্ডে নেওয়া হয়। এক মামলায় জামিন পেলেও কারাগারের ফটক থেকে অন্য মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখিয়ে ফেরত পাঠানো হতো। বিএনপি দাবি করে, অধিকাংশ মামলাই ছিল মনগড়া, সাজানো এবং প্রমাণবিহীন। এই দীর্ঘ বন্দিত্বের সময়ে তিনি দেখতে পাননি তার কন্যাসন্তানের বেড়ে ওঠা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রায় ৯ বছর আমি জেলে ছিলাম। আমার মেয়েটা তখন শিশু ছিল। আজ সে তরুণী। আমি বাবা হয়েও তার হাত ধরে স্কুলে যেতে পারিনি, পরীক্ষার হলে নিয়ে যেতে পারিনি। এসব অভিজ্ঞতা বেদনাদায়ক। কারাগারে থাকাকালীন সময়েই মারা যান তার দুই ভাই—ইছহাক কাদের চৌধুরী ও মঈন কাদের চৌধুরী। দুইবারই তিনি আদালতে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেন ভাইয়ের জানাজায় অংশ নিতে, কিন্তু আদালত তা মঞ্জুর করেনি। শুধু তাই নয়, তার বড় ভাই জসিম চৌধুরীকে বিভিন্ন ব্যাংকের অবৈধ মামলায় বছরের পর বছর জেলে বন্দি করে রাখা হয়। তার পরিবারের সদস্যদের মতে, হাসিনা সরকার চাপ প্রয়োগ করে ব্যাংকগুলোকে এসব মামলা করতে বাধ্য করে। এ ছিল একটি অবৈধ সরকারের প্রতিহিংসার নিষ্ঠুরতম রূপ। 

 ‘অর্থনৈতিক মৃত্যু’

 আসলাম চৌধুরীর পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রাইজিং গ্রুপ ছিল চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ শিল্প গোষ্ঠী। রাইজিং স্টিল, রাইজিং অটো ব্রিকস, কোল্ড স্টোরেজ, সিএনজি স্টেশন—সব মিলিয়ে শত কোটি টাকার ব্যবসা ছিল এই পরিবারের। সরকারের পরিকল্পিত পদক্ষেপ ব্যাংকগুলোর উপর চাপ প্রয়োগ করে ঋণপত্র বাতিল করা হয়। জাহাজ আমদানিতে এনওসি বন্ধ করে দেওয়া হয়। রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। কিছু কারখানায় সরকারদলীয় ক্যাডারদের লুটপাট হয়। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে যিনি নিজ যোগ্যতায় কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছিলেন, সেই আসলাম চৌধুরী হয়ে পড়েন ঋণখেলাপি এবং তার প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়।

মুক্তির পর জনস্রোত

৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০ আগস্ট মুক্তি পান আসলাম চৌধুরী। মুক্তির দিন চট্টগ্রাম কারাগারের সামনে কয়েক হাজার নেতাকর্মী ভিড় করেন। ভাটিয়ারী পর্যন্ত দীর্ঘ ৫০ কিলোমিটার পথজুড়ে চলে তার গাড়িবহর। নেতাকর্মীরা ফুল ছিটিয়ে তাকে বরণ করে নেন। সেদিন বৃষ্টির মধ্যে ভিজে তিনি সীতাকুণ্ডের জলিল পাড়ায় নিজ বাড়িতে প্রবেশ করেন, মা-বাবা ও ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন অশ্রুসজল চোখে। সেই দিনে তিনি নিজেই আসরের নামাজের ইমামতি করেন।

বর্তমান অবস্থান ও বিতর্ক

মুক্তির পর আবারো রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। বিভিন্ন এলাকায় সংগঠন গোছানোর কাজ শুরু করেন। কিছু পোস্টারে আসলাম চৌধুরী নতুনভাবে আসছে বলে প্রচার করা হয়। এরপর অনেকে আসলাম চৌধুরী নতুন দল নিয়ে আসছেন বলে অপপ্রচার করেন। আসলাম চৌধুরী তা অস্বীকার করে বলেন, এসব তাকে বিতর্কিত করার জন্য অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমি বিএনপির একজন দায়িত্বশীল কর্মী। বিএনপির বাইরে আমার কোনও পরিকল্পনা নেই। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটি ঘিরে ফের আলোচনায় আসেন তিনি। অনেকে চান, তিনি আবার নেতৃত্বে আসুন। তবে তিনি আপাতত সেই দায়িত্ব না ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন। 

বিএনপির নেতারা বলেন, আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল নয়, তবে ভয়াবহ নিদর্শন। একজন  শিক্ষিত পেশাজীবী, সফল ব্যবসায়ী, জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি—সবই ধ্বংস করা হয়। নেতারা বলেন, তাকে শুধু জেলে নয়, জীবনের প্রতিটি স্তরে গলা টিপে ধরা হয়েছে। এটা একটি জাতির জন্য লজ্জার ইতিহাস।

ইই

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।